রক্তঝরা জেলহত্যা দিবস আজ

NationalleaderJelhotta
সমাজের কথা ডেস্ক॥ আজ সেই ভয়াল ৩ নভেম্বর। বাঙালী জাতি, বিশ্বমানবতা ও গণতন্ত্রের ইতিহাসে বেদনাবিধুর রক্তঝরা জঘন্যতম কলঙ্কময় দিন। রক্তঝরা জেলহত্যা দিবস। স্বাধীন বাংলাদেশের যে কটি দিন চিরকাল কালো দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে, তার একটি ৩ নভেম্বর। যে কয়েকটি ঘটনা বাংলাদেশকে কাক্সিক্ষত অর্জনের পথে বাধা তৈরি করেছে, তার মধ্যে অন্যতমটি ঘটেছিল ১৯৭৫ সালের এ দিনে। নিষ্ঠুর এ বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের ৩৮ বছর পেরিয়ে গেলেও বিচারের বাণী আজও কাঁদছে নিভৃতে।
বাঙালী জাতিকে নেতৃত্বশূন্য করতে ৩৮ বছর আগে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর মধ্যরাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অন্তরীণ মহান মুক্তিযুদ্ধের নায়ক, মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী চার জাতীয় নেতা বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ, মন্ত্রিসভার সদস্য ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে স্বাধীনতাবিরোধী ষড়যন্ত্রকারীরা দেশী-বিদেশী দোসরদের সহযোগিতায় নির্মম ও নৃশংসভাবে হত্যা করে। কারাগারের রাষ্ট্রের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা অবস্থায় এ ধরনের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।
এর আগে একই বছরের ১৫ আগস্ট হত্যা করা হয় স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি জাতিরজনক ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তাঁর ঘনিষ্ঠ এই চার সহকর্মীকে গ্রেফতার করে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে পাঠানো হয়েছিল। পরবর্তী অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ক্যু-পাল্টা ক্যু’র রক্তাক্ত অধ্যায়ে মানবতার শত্রু ও বঙ্গবন্ধুর হন্তারক ওই একই পরাজিত শক্তির দোসর বিপথগামী কিছু সেনাসদস্য কারাগারে ঢুকে জাতীয় এই চার নেতাকে হত্যা করে। সেই থেকে প্রতি বছর দিনটি জেলহত্যা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। এবারের জেল হত্যা দিবসের মূল সেøাগান ‘জেল হত্যার পুনর্বিচার ও খুনীদের ফাঁসি চাই।’
৩৮ বছর পেরিয়ে গেলেও মানব সভ্যতার ইতিহাসে নিষ্ঠুর ও জঘন্যতম এ হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ বিচার হয়নি। ২০০৮ সালের আগস্টে হাইকোর্টের রায়ে আত্মস্বীকৃত খুনিদের অধিকাংশ আসামি খালাস পাওয়ার পর বিচারের দাবি এতটুকু কমেনি। এখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বঙ্গবন্ধুরই হাতে গড়া রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ। বঙ্গবন্ধুর খুনীদের ফাঁসির রায় কার্যকর হয়েছে। এখন দেশবাসী আশায় বুক বেঁধেছে, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার মতো জেল হত্যাকাণ্ডেরও অধিকতর তদন্তের মাধ্যমে ঘাতকদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার হবে।
স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের শত্রুরা সেদিন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অন্তরীণ দেশমাতৃকার সেরা সন্তান এই চার জাতীয় নেতাকে শুধুমাত্র গুলি চালিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, কাপুরুষের মতো গুলিবিদ্ধ দেহকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে একাত্তরের পরাজয়ের জ্বালা মিটিয়েছিল। বাঙালীকে পিছিয়ে দিয়েছিল প্রগতি-সমৃদ্ধির অগ্রমিছিল থেকে। ইতিহাসের এই নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় শুধু বাংলাদেশের মানুষই নয়, স্তম্ভিত হয়েছিল সমগ্র বিশ্ব। বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার হত্যাকাণ্ড ছিল একই ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতা। বিশ্বাসঘাতক খুনীদের পরিকল্পনা ও উদ্দেশ্যে আজ জাতির সামনে পরিষ্কার। মিথ্যা কুয়াশার ধূম্রজাল ছিন্ন করে আজ নতুন সূর্যের আলোকের মতো প্রকাশিত হয়েছে সত্য।
জেল হত্যাকাণ্ডের পর দীর্ঘ ২১ বছর এ বিচার প্রক্রিয়াকে ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে জেলহত্যা মামলার প্রক্রিয়া পুনরুজ্জীবিত করে। ৮ বছরেরও বেশি সময় ধরে এ বিচারকাজ চলার পর গত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে ২০০৪ সালের ২০ অক্টোবর মামলাটির রায় ঘোষণা করা হয়। রায়ে ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২০ আসামির মধ্যে ১৫ জনের সাজা হয়। এর মধ্যে তিন সাবেক সেনা কর্মকর্তার ফাঁসি এবং ১২ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।
অন্যদিকে মামলার তদন্তে পাওয়া হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনার অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় যে ৫ আসামিকে খালাস দেয়া হয় তারা হচ্ছেন- বিএনপি নেতা মরহুম কে এম ওবায়দুর রহমান, বিএনপি নেতা শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, সাবেক মন্ত্রী মরহুম তাহেরউদ্দিন ঠাকুর, নুরুল ইসলাম মঞ্জুর এবং মেজর (অব) খায়রুজ্জামান। তবে জাতীয় চার নেতার পরিবারের সদস্যরা এ রায়কে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেপ্রণোদিত ও প্রহসনের রায় আখ্যায়িত করে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, জেলহত্যার ষড়যন্ত্রের দায়ে কাউকে শাস্তি দেয়া হয়নি।
বর্তমান সরকারের কাছে শুধু জাতীয় নেতার পরিবারের সদস্যরাই নন, আজ প্রতিটি বাঙালীর দাবি জাতীয় চার নেতার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা হোক। তাই এবারের জেল হত্যা দিবসে শাসক দল আওয়ামী লীগসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সকল রাজনৈতিক দলের মূল সেøাগান হচ্ছে- ‘জেল হত্যাকাণ্ডের পুনর্বিচারের মাধ্যমে খুনীদের ফাঁসি দেয়া হোক।’

শেয়ার