জামায়াতকে নিবন্ধন দেয়া ‘কর্তৃত্ব বহির্ভূত’ ছিল

highCourt
সমাজের কথা ডেস্ক॥ পাঁচ বছর আগে জামায়াতে ইসলামীকে কর্তৃত্ব বহির্ভূতভাবে নির্বাচন কমিশন নিবন্ধন দিয়েছিল বলে হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়েছে।
দলটি নিষিদ্ধ করে হাই কোর্টের দেয়া পূর্ণাঙ্গ রায়ে তা দেখা গেছে। তিন বিচারকের স্বাক্ষরের পর শনিবার এই রায় প্রকাশিত হয়েছে।
আদালতের আদেশ শিরোধার্য মেনে রায় বাস্তবায়নের কথা বলেছে নির্বাচন কমিশন। সেক্ষেত্রে আগামী নির্বাচনে জামায়াত অংশ নিতে পারবে না।
হাই কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত রয়েছে জামায়াতের। তবে সর্বোচ্চ আদালতেও হাই কোর্টের রায় বহাল থাকলে দলটির নির্বাচনে অংশ নেয়ার পথ খুলবে না।
গত ১ অগাস্ট উন্মুক্ত আদালতে তিন বিচারকের বেঞ্চ সংবিধানের সঙ্গে গঠনতন্ত্র সাংঘর্ষিক হওয়ায় জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করে রায় দেয়।
সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে দেয়া ওই রায়ে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক জামায়াতের নিবন্ধন বাতিলের পক্ষে মত দেন। তবে ভিন্নমত জানান বেঞ্চের প্রিজাইডিং বিচারক বিচারপতি এম মোয়াজ্জাম হোসেন।
সংক্ষিপ্ত রায়ে বিচারপতি এম মোয়াজ্জাম হোসেন বলেন, “বাই মেজরিটি, রুল ইজ মেইড অ্যাবসলিউট অ্যান্ড রেজিস্ট্রেশন গিভেন টু জামায়াত বাই ইলেকশন কমিশন ইজ ডিক্লেয়ার্ড ইলিগ্যাল অ্যান্ড ভয়েড।”
পূর্ণাঙ্গ রায়ের মূল অংশটি লিখেছেন বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক।
তিনি লেখেন, “জামায়াত এবং নির্বাচন কমিশন যুক্তি দেখিয়েছে, নিবন্ধনটি সাময়িক ছিল। কিন্তু সাময়িক নিবন্ধন দেয়া যায় বলে আমরা কোনো বিধান গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে পাইনি। নিবন্ধন সনদেও সাময়িক নিবন্ধন বলে কোনো বিষয় আমরা পাইনি।”
২০০৮ সালে ৩৮টি দলের সঙ্গে আগের সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী জামায়াতও নিবন্ধন পায়। আইন অনুযায়ী, শুধু নিবন্ধিত দলগুলোই নির্বাচনে অংশ নিতে পারে।
জামায়াতকে নিবন্ধন দেয়ার সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে তরিকত ফেডারেশনের সেক্রেটারি জেনারেল সৈয়দ রেজাউল হক চাঁদপুরী, জাকের পার্টির মহাসচিব মুন্সি আবদুল লতিফ, সম্মিলিত ইসলামী জোটের প্রেসিডেন্ট মাওলানা জিয়াউল হাসানসহ ২৫ জন ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে একটি রিট আবেদন করে।
ওই রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৯ সালের ২৭ জানুয়ারি হাই কোর্ট একটি রুল জারি করে। রাজনৈতিক দল হিসাবে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন কেন আইনগত কর্তৃত্ব বহির্ভূত এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের লঙ্ঘন ঘোষণা করা হবে না- তা জানতে চাওয়া হয় ওই রুলে।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়, “সংশ্লিষ্ট বিধিতে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে এটা বলেছে, শর্ত পূরণ না করে দেয়া গঠনতন্ত্রের ভিত্তিতে এ ধরনের কোনো নিবন্ধন দেয়ার এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের নেই। অথবা নির্বাচন কমিশন ওই গঠনতন্ত্র সংশোধনের মাধ্যমে শর্ত পূরণে জামায়াতকে অনুরোধ করতে পারে না। কারণ ওই নিবন্ধন প্রথম আইনি কর্তৃত্ব বহির্ভূতভাবে করা হয়েছে।”
“এর মাধ্যমে আমরা এটা বলতে পারি, এ বিষয়ে জারি করা রুলের সারবত্তা রয়েছে। রুলকে চূড়ান্ত করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ২০০৮ সালের ৪ নভেম্বর জামায়াতকে দেয়া নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন কর্তৃত্ব বহির্ভূত এবং ফলহীন ঘোষণা করা হচ্ছে।’
এম ইনায়েতুর রহিম কাজী রেজাউল হকের রায়ের সঙ্গে একমত পোষণ করে একটি সংযুক্তি দেন।
অন্যদিকে বিচারপতি এম মোয়াজ্জাম হোসেন তার দুই সহকর্মীর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে তার রায়ে বলেন, জামায়াতের নিবন্ধন নিয়ে করা রিট আবেদন গ্রহণযোগ্য নয়।
‘আমি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামীর নিবন্ধন নির্বাচন কমিশন নিষ্পত্তি করার নির্দেশনা দিয়ে রুল নিষ্পত্তি করলে ন্যায়বিচার হবে। সে মতে, যুক্তিযুক্ত দ্রুত সময়ে আইন অনুসারে জামায়াতের নিবন্ধন ইস্যু নিষ্পত্তি করার নির্দেশনা দিচ্ছি।”
যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার দাবি জোরালো হয়ে ওঠার মধ্যেই হাই কোর্ট গত অগাস্টে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিলের রায় দেয়।
রায়ের প্রতিবাদে দুদিন হরতাল ডাকে দলটি। দলের বিক্ষুব্ধ নেতা-কর্মীরা বিভিন্ন স্থানে ভাংচুর ও গাড়িতেও আগুন দেয়।
জামায়াতে ইসলামীর সূচনা হয় উপমহাদেশের বিতর্কিত ধর্মীয় রাজনীতিক আবুল আলা মওদুদীর নেতৃত্বে ১৯৪১ সালের ২৬ অগাস্ট, তখন এর নাম ছিল জামায়াতে ইসলামী হিন্দ।
পাকিস্তানের স্বাধীনতার পর মুসলিম পারিবারিক আইনের বিরোধিতা করায় ১৯৬৪ সালে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা হলেও পরে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলন যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে, তখন ১১ দফাসহ বিভিন্ন দাবির বিরোধিতা করে জামায়াত।
১৯৭১ সালের পর স্বাধীন বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকায় জামায়াতও এর আওতায় পড়ে। বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগে পরবর্তী সামরিক জান্তারা জামায়াতকে রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ করে দেয়।
মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সহায়তা করতে রাজাকার, আলবদর, আলশামস্ নামে বিভিন্ন দল গঠন করে জামায়াত ও এর তখনকার ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘ। তারা সারা দেশে ব্যাপক হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাটের মতো যুদ্ধাপরাধ ঘটায়।
একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে রায়েও দল হিসেবে যুদ্ধাপরাধে দলটির সম্পৃক্ততা উঠে এসেছে।
একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের জন্য জামায়াতের তৎকালীন আমির গোলাম আযমসহ শীর্ষ নেতাদের প্রায় সবারই সাজা হয়েছে।

শেয়ার