‘আমিই আদুরি’

Adori
সমাজের কথা ডেস্ক॥
মাস খানেক আগে ছোট্ট মেয়েটিকে যখন হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তখন অনেকেই আতকে উঠেছেন- বলেছেন হায় হায় এ তো দেখি ‘জীবন্ত কঙ্কাল’। নির্মম! ছোট ভাইটিও সেই ‘কঙ্কাল’ দেখে ভয়ে কেঁদে ফেলেছিল। এখন আর সে কাঁদে না। কাছে আসে, কথা বলে।
মেয়েটি হলো মিরপুরের পল্লবীতে ময়লার স্তূপ থেকে উদ্ধার হওয়া গৃহকর্মী আদুরি। দিনটি ছিল ২৩ সেপ্টেম্বর। উদ্ধারের পর কঙ্কালসার আদুরির স্থান হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি)। সেখানেই আছে সে।

এরই মধ্যে নির্মম নির্যাতনের দায়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন গৃহকর্ত্রী নওরীন জাহান নদী।

বৃহস্পতিবার ওসিসিতে আদুরির খোঁজ নিতে যান এই প্রতিবেদক। সমন্বয়ক ডা. বিলকিস বেগম একজন অফিস সহকারীকে আদুরিকে তার কক্ষে নিয়ে আসতে বললেও পাওয়া যাচ্ছিল না তাকে।

প্রায় ২০/২৫ মিনিটেও দেখা না পেয়ে একটি শিশুর কাছে আদুরি কোথায়- তা জানতে চান এই প্রতিবেদক।

তাৎক্ষণিক ছোট্ট মেয়েটি বলে ওঠে, “আমিই আদুরি। ক্যান আমারে চিনতে পারছেন না? নদী আমারেই ডাস্টবিনে ফালাইয়া দিছিলো।”

প্রায় মাসাধিক সময়ে আদুরির শরীরে নির্যাতনের ক্ষত অনেকটাই শুকিয়েছে। কপালে টিপ পরেছে সে। নাকে ফুল, কানে দুল আর রঙ করা নখ নিয়ে বেশ হাসিখুশি দেখাচ্ছিল তাকে।

বিলকিস বেগম জানান, আদুরি টিপ, নাক ফুল, কানে দুল, আলতা দিতে ভালবাসে। তাই তাকে এগুলো দেয়া হয়েছে।

তবে হাতের ব্যথার কারণে এখনো চুড়ি পরতে পারে না আদুরি। সে বলে, “হাতে ব্যথা পাই, তাই ছুড়ি পরতে পারি না।”

আদুরিকে কোনদিন ছুটি দেয়া হবে জানতে চাইলে বিলকিস বেগম বলেন, আগামী সপ্তাহে ছুটি দেয়া হবে। তবে দিনক্ষণ পরে জানানো হবে।

তিনি বলেন, যদি গ্রামের বাড়িতে গিয়ে আদুরি সমস্যায় পড়ে সেক্ষেত্রে আবার ঢাকায় ফিরিয়ে এনে সরকারি সেল্টার হোমে রাখা হবে।

আদুরির শরীরের ক্ষত শুকাতে শুরু করলেও ওর মনে নির্যাতনের ক্ষত এখনো যেন সজীব। কে মারধর করতো- এমন প্রশ্নের তাৎক্ষণাৎ উত্তরই যেন জানান দিচ্ছিল মনের ক্ষতের অবস্থা।

“নদী আমাকে মারতো। আমারে খাইতে দিত না। না খাইয়া থাকতাম। না খাইতে খাইতে শরীরে বল পাইতাম না। শেষে নদী আমারে ময়লার মইধ্যে ফালাইয়া দিছে।”

গ্রামে যেতে ইচ্ছে করে কি না জানতে চাইলে আদুরি বলে, “খুব ইচ্ছা করে। ভাইয়েরা আমারে আদর কইরা তারপর সাগরে জাল বাইতে যাইবো।”

আদুরিদের বাড়ি পটুয়াখালীর বাউফলের জৈনকাঠি গ্রামে। তিন বছর আগে বাবা আব্দুল খালেক মারা যাওয়ার পর নয় সন্তান নিয়ে গ্রামেই থাকছিলেন শাফিয়া (৬০)।

মা শাফিয়া জানান, হাসপাতালে আনার পর ছোট ভাই পান্না আদুরিকে দেখতে এসেছিল। কিন্তু পান্না তাকে দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিল, কারণ অনেক রোগা ছিল সে।

আদুরির ভাষ্যমতে, “এহন আর পান্না আমারে দেইখা ভয় পায় না। অয় আমার লগে খেলতে চায়। আমারে আপু আপু বইলা ডাকে।”

শেয়ার