সমঝোতায় না এলে বিএনপিকে ছাড়াই নির্বাচন

cabinet metting
বাংলানিউজ ॥
প্রধানমন্ত্রীর ফোনের পরও বিরোধী দলীয় নেতা সংলাপে না এলে বিএনপিকে ছাড়াই নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করে নির্বাচন করার চিন্তা করছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করে তার এ চিন্তার কথা জানিয়েছেন। তবে বিএনপিকে আনার চেষ্টা চালানো হবে। একই সঙ্গে হরতালকে কেন্দ্র করে হামলাকারীদের তিনি কঠোর হস্তে দমন করতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন। এজন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতা করতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদেরও নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।
সোমবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে নির্ধারিত আলোচনার বাইরে দেশের চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট নিয়ে আলোচনা করে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব কথা মন্ত্রীদের জানিয়েছেন।
বৈঠক সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর মনোভাব হচ্ছে, বিএনপি যোগ না দিলেও সর্বদলীয় অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হবে এবং নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সেক্ষেত্রে জাতীয় পার্টি এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে গঠন করা হবে সর্বদলীয় সরকার। তবে জামায়াতকে সংলাপ বা সর্বদলীয় সরকারে কোনোভাবেই রাখা হবে না।
বৈঠক শেষে একজন মন্ত্রী জানিয়েছেন, বিএনপি সংলাপে না এলে জাতীয় পার্টিসহ অন্যান্য দলের সঙ্গে সংলাপ হবে।
সর্বদলীয় সরকার বিষয়ে আওয়ামী লীগ বর্তমান অবস্থান থেকে সরে আসবে কি না? জানতে চাইলে বৈঠকে অংশ নেওয়া একজন মন্ত্রী বলেন, বিএনপি এগিয়ে না এলে আওয়ামী লীগ তার অবস্থান থেকে সরবে না। কেন আওয়ামী লীগ তার অবস্থান থেকে সরবে?
বৈঠক সূত্রে জানা যায়, মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকে নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় অন্তর্বর্তী সরকারের বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে।
সূত্র মতে, এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি অংশ না নিলেও জাতীয় পার্টিসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে আগামী সংসদ নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার গঠন করার চেষ্টা করা হবে। তবে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, বিএনপি নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার ও আগামী নির্বাচনে অংশ নেবে।
শনিবার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়াকে ফোন করে সংলাপে বসার আহ্বান জানান। গণভবনে খালেদা জিয়াকে নৈশভোজের আমন্ত্রণও জানান শেখ হাসিনা।
কিন্তু খালেদা জিয়া ও পরে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট তিন দিনের টানা হরতাল বহাল রেখে প্রধানমন্ত্রীকে হরতাল শেষে মঙ্গলবারের পর সংলাপের কথা বলেন।
অন্য এক মন্ত্রী জানান, বিএনপিকে শেষ পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকার গঠন প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার চেষ্টা চলবে। তারা না এলে জাতীয় পার্টিসহ অন্যান্য দলগুলোকে নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন ও নির্বাচন করা হবে।
ওই মন্ত্রী আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় অন্তর্বর্তী সরকারে বিএনপিকে আনতে আমি শেষ পর্যন্ত চেষ্টা চালাবো। আমার বিশ্বাস, তারা আসবে।
তিনি জানান, এরই মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন ও নির্বাচন বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন। অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করার লক্ষ্যে জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে তার। অন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গেও আলোচনা করবেন প্রধানমন্ত্রী। গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনসহ অনেককে ইতোমধ্যে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
গত ১৮ অক্টোবর জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সর্বদলীয় সরকার গঠনের জন্য বিএনপিসহ অন্যান্য দলের কাছে নাম প্রস্তাব করেন। তবে অন্তর্বর্তী সরকারে জামায়াতকে আমন্ত্রণ জানানো হবে না বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
এদিকে বিএনপির পক্ষে জানানো হয়েছে, টানা হরতালের পরে বিএনপির পক্ষ থেকে সংলাপের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হবে না। সোমবার নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এ কথা জানিয়েছেন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও মুখপাত্র মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
১৪ দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর ফোনকলে সাড়া না দেওয়ায় সংলাপ চাইলে এখন বিএনপিকে উদ্যোগ নিতে হবে। সোমবার ধানমণ্ডিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে বৈঠকের পর ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম এক সংবাদ সম্মেলনে একথা বলেন।
হরতালের পর সংলাপের আমন্ত্রণ জানাতে বিএনপির আহ্বানের প্রেক্ষাপটে সোমবার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনালাপের পরও হরতাল প্রত্যাহার না করায় বিরোধী দলীয় নেতার কঠোর সমালোচনা করেছেন মন্ত্রিসভার সদস্যরাও। তারা বলেন, আমরা ছাড় দিয়ে বিরোধী দলীয় নেতাকে ফোন করেছি। তিনি তাতে সাড়া না দিলে আমরা সংবিধান অনুযায়ী চলবো।
বিরোধী দলীয় নেতার সঙ্গে ফোনালাপের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভার সদস্যদের অবহিত করে বলেছেন, কথোপকথনের সময় বিরোধী দলীয় নেতা ‘অ্যাগ্রেসিভ’ ছিলেন।
২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে গ্রেনেড হামলা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলীয় নেতাকে বলেন, আপনারা এ হামলা চালিয়েছেন। জবাবে খালেদা জিয়া বলেন, আমরা নই, আপনার দলের লোকেরাই এ হামলা চালিয়েছিলেন।
মন্ত্রিসভার বৈঠকে গত কয়েক দিনের বিএনপি-জামায়াতের হামলা ও নৈরাজ্যের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও দলীয় নেতাকর্মীদের এ বিষয়ে নির্দেশনা দেন।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বিরোধী দলের হামলা দৃঢ়ভাবে প্রতিরোধ করতে নেতাকর্মীদের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
বিচারপতি, দলীয় সংসদ সদস্য, বিশিষ্ট ও রাজনৈতিক ব্যক্তিসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও তাদের বাসায় ককটেল ও বোমা হামলার ঘটনায় উদ্বেগও প্রকাশ করেন শেখ হাসিনা। এসব হামলা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা ১৯৭১ সালে বুদ্ধিজীবীদের হত্যার মতো কর্মকাণ্ড শুরু করেছে। এসব কর্মকাণ্ড দলীয় নেতাকর্মীদের দৃঢ়ভাবে প্রতিরোধ করা ছাড়াও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহায়তা করার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।
রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও তাদের বাসায় বিএনপি-জামায়াতের ককটেল ও হাতবোমা হামলা বন্ধে কি ধরনের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে- সে বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছেও জানতে চান প্রধানমন্ত্রী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন।
এদিকে দেশব্যাপী হামলার বিষয়ে টেলিফোনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর বাংলানিউজকে জানান, এ ধরনের হামলা করায় বিএনপি-জামায়াত যে সন্ত্রাসী তা প্রমাণিত হয়েছে। এসব হামলা বন্ধে এবং জনগণের জান-মাল রক্ষা করতে আমরা সকল পদক্ষেপ নিয়েছি। আইন -শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের পদক্ষেপগুলোকে আরো জোরালো করেছে।
তিনি বলেন, আমরা হামলাকারীদের ধরছি এবং আইন অনুযায়ী বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছি।

শেয়ার