আনন্দবাজারের প্রতিবেদন খালেদাপুত্রের সহযোগী আইএসআই, উদ্বিগ্ন দিল্লি

anandabajar
সমাজের কথা ডেস্ক॥ বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকার গড়া নিয়ে শুরু হয়েছে সংঘাত। শুক্রবার ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভা করে রোববার থেকে টানা তিন দিন হরতালের ডাক দিয়েছেন বিরোধী বিএনপি-নেতা খালেদা জিয়া। দেশের বিভিন্ন শহরে সরকার ও বিরোধী দলের কর্মীদের মধ্যে শুরু হয়েছে সংঘর্ষ। এ দিনই মারা গিয়েছেন সাত জন। আহত শতাধিক। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের গোয়েন্দাদের পাঠানো বেশ কিছু তথ্য হাতে পেয়ে দিল্লির মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানের কার্যকলাপ। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দৈনিক আনন্দবাজারের এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকার পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই পুরোদস্তুর সাহায্য-সহযোগিতা করে চলেছে লন্ডনের এডমন্টনে স্বেচ্ছানির্বাসনে থাকা তারেক ও তার দলবলকে। একই সঙ্গে উপমহাদেশে সক্রিয় মৌলবাদী ও জঙ্গি নেতাদের সঙ্গেও নিবিড় যোগাযোগ রেখে চলেছেন বিএনপি’র এই নেতা। গোয়েন্দা সমন্বয়ের মাধ্যমে দিল্লির হাতে আসা এই সব তথ্যের ভিত্তিতে একটি রিপোর্ট তৈরি করে ইতিমধ্যেই পাঠানো হয়েছে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহের কাছে। লন্ডন থেকে ঢাকা, সিঙ্গাপুর-সহ বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় করা তারেকের যাবতীয় ফোন কলের রেকর্ডও বাংলাদেশের গোয়েন্দারা দিল্লিকে দিয়েছেন। সেই ‘কল লিস্ট’-ও এখন খতিয়ে দেখছেন দিল্লির কূটনৈতিক কর্তারা।

আনন্দবাজার জানায়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কূটনীতিকরা বলছেন, বাংলাদেশ সার্বভৌম রাষ্ট্র। সেখানে কোন দল ক্ষমতায় আসবে, বাংলাদেশের মানুষই তা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারণ করবেন। কোনো বিশেষ দলের প্রতি নয়া দিল্লির পক্ষপাতের প্রশ্ন নেই। বিরোধী নেত্রী হিসেবে দিল্লি সফরে আসা খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলেন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ এবং তৎকালীন কেন্দ্রের শীর্ষ মন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায়। শাসক দল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের তাতে গোঁসা হলেও দিল্লি আমল দেয়নি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, কিন্তু ভারতের উদ্বেগের কারণটা অন্য। বাংলাদেশের গোয়েন্দাদের পাঠানো তথ্যে স্পষ্ট, বাংলাদেশে ক্ষমতায় ফিরতে আইএসআই ও মৌলবাদী শক্তির সাহায্য নিচ্ছেন বিএনপি-র উদীয়মান নেতা তারেক রহমান। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক অফিসারের কথায়, আগের বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে আইএসআইয়ের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় বাংলাদেশ কার্যত মৌলবাদীদের ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছিল। জঙ্গিদের বাড়বাড়ন্ত শুধু বাংলাদেশের প্রশাসনকেই চ্যালেঞ্জ জানায়নি, গোটা ভারতীয় উপমহাদেশের নিরাপত্তাকে বিপন্ন করে তুলেছিল। ভারত-বিরোধী নানা জঙ্গি গোষ্ঠীকেও বাংলাদেশের মাটিতে ঘাঁটি গাড়তে দিয়েছিল বিএনপি-জামাত সরকার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই অফিসার বলেন, খালেদা জিয়া দিল্লিতে এসে অঙ্গীকার করে গিয়েছিলেন, ফের ক্ষমতায় এলে অতীতের সে-সব ভুল তার দল আর করবে না। কিন্তু তাদের অভিযোগ, তারেকের কার্যকলাপ মোটেই তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
বাংলাদেশের গোয়েন্দাদের থেকে তারেকের আইএসআই-সংস্রব ও মৌলবাদীদের সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য পাওয়ার পর আশু ও দীর্ঘমেয়াদি দু’ধরনের বিপদই দেখছে দিল্লি।

আনন্দবাজার লিখেছে, অন্তর্বর্তী সরকার নিয়ে সংঘাত যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাতে নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ অশান্ত হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্তারা। বিএনপি-র সহযোগিতায় মৌলবাদীরা এই সুযোগে সক্রিয় হলে সেই অশান্তি যত বাড়বে, সংখ্যালঘুদের জীবন-জীবিকাও বিপন্ন হয়ে পড়বে। অশান্ত আবহাওয়ার সুযোগে ফের সেনা-অভ্যুত্থানের মতো অবাঞ্ছিত ঘটনার আশঙ্কাও থেকে যায়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্তারা বলছেন, এটা আশু বিপদ। দীর্ঘমেয়াদী বিপদটির প্রভাব আরো সুদূরপ্রসারী।
ভারতীয় কূটনীতিকদের মতে, কংগ্রেসের মতোই নেতৃত্ব পরিবর্তনের একটি প্রক্রিয়া চলছে বিএনপিতে। কংগ্রেসে যেমন সোনিয়া গান্ধীর পরের প্রজন্মের নেতা হিসেবে রাহুলকে তুলে আনা হচ্ছে, ৬৮ বছরের খালেদা জিয়াও তেমনই বিএনপি-র দায়িত্ব ধীরে ধীরে তুলে দিচ্ছেন দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ৪৬ বছরের তারেকের হাতে। বস্তুত ২০০১ সাল থেকেই রাজনৈতিক ভাবে অতিসক্রিয় তারেক রহমান। সেই সময়ে ঢাকায় খালেদার বাড়ি ‘হাওয়া ভবন’-এ বসে নির্বাচন পরিচালনায় বড় ভূমিকা নিয়েছিলেন তিনি। পরবর্তীকালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের জমানায় তিনি ছিলেন ক্ষমতার দ্বিতীয় কেন্দ্র। পাঁচ বছর আগে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসার ঠিক আগে স্ত্রী-কন্যাকে নিয়ে লন্ডনে চলে যান তারেক। কিন্তু বিএনপি-র শীর্ষ নেতারা মাঝেমধ্যেই লন্ডন গিয়ে তার নির্দেশ নিয়ে আসেন। ২০০৯ সালে বিএনপি-র ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল সাত দিন ধরে নানা অনুষ্ঠানে তারেকের জন্মদিন পালন করে। খালেদা জিয়া নিজেও সেই অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের এমন এক ভাবী নেতার সঙ্গে আইএসআইয়ের যোগাযোগ নিশ্চিতভাবেই ভারতের পক্ষে সুসংবাদ নয়। কারণ ভবিষ্যতে বিএনপি-র নীতি-নির্ধারণেও এই পাক ও মৌলবাদী-ঘেঁষা স্বর শোনা যেতে পারে। বাংলাদেশ ফের জঙ্গিদের ঘাঁটি হয়ে উঠুক এটা কখনোই দিল্লির কাম্য নয়।

শেয়ার