রেলের ট্রান্স এশিয়ান সংযোগ

বাংলাদেশ রেলের আধুনিকায়ন ও একে ক্রমান্বয়ে ট্রান্স এশিয়ান রেলের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। জানা গেছে, এই লক্ষ্যে সমীক্ষা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ গত প্রায় দেড় বছর ধরে চলছে। বাংলাদেশে গণপরিবহনের উন্নয়নের ক্ষেত্রে এটা নিঃসন্দেহে একটি সুখবর। নিরাপদ, আরামদায়ক ও সাশ্রয়ী পরিবহন হিসেবে রেলের কোন বিকল্প নেই। দুর্ভাগ্যবশত, স্বাধীনতার পর গত চার দশকে সড়কপথ যেভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে; রেল সেভাবে হয়নি। বরং রেল অনেকাংশে সঙ্কুচিত হয়েছে। অনেক পরিচিত ও চালু রেলরুট বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশে পরিবহন খাতে অনেক বেড়েছে। সড়কপথে চাপ অনেক বেড়েছে; নিয়মিত সংস্কারের অভাবে অনেক সড়কই চলাচলের অযোগ্য হয়ে গেছে। এখানে সড়কপথে যত দুর্ঘটনা হয়, খুব কম দেশেই এমনটা হয়। অথচ তুলনামূলকভাবে রেল দুর্ঘটনা যথেষ্ট কম। বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর রেলের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে কিছু সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়েছে। এর মধ্যে আছে ঢাকা-বরিশাল রেলপথ, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার হয়ে মিয়ানমার সীমান্ত পর্যন্ত নতুন রেলপথ নির্মাণ প্রভৃতি। তবে এখন পর্যন্ত এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। তবে জনগণের প্রত্যাশা ছিল, বর্তমান সরকারের আমলে বন্ধ হওয়া কিছু জনপ্রিয় রেলরুট আবার চালু হবে। এর মধ্যে আছে কালুখালী-ভাটিয়াপাড়া রেলরুট, পাঁচুড়িয়া-ফরিদপুর রেলরুট, রূপসা-বাগেরহাট রেলরুট প্রভৃতি। সরকার ট্রান্স এশিয়ান রেলের সঙ্গে বাংলাদেশ রেলের সংযুক্তির যে পরিকল্পনা নিয়েছেÑ তা অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে তার আগে দেশের অভ্যন্তরীণ রেলরুটসমূহকে আরও বেশি সক্রিয় ও সম্প্রসারিত করা জরুরী। বাংলাদেশে এখনও এমন অনেক জেলা আছে; যেখানে কোন রেলপথ নেই। অথচ প্রায় দেড় শত বছর আগে এ অঞ্চলে রেল চালু হয়েছিল। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকরা তৎকালীন পূর্ববঙ্গে রেলের একটি মজবুত অবকাঠামো গড়ে তুলেছিল। তবে ১৯৪৭ সালে পর এখানে নতুন করে রেলের উন্নয়ন হয়নি; ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর এখানে অনেক স্টেশন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে রেল সংযোগ গড়ে উঠবেÑ এ খবরে আমরা সবাই আনন্দিত। এর ফলে বাংলাদেশের মানুষ সহজেই রেলপথে ভারত, মিয়ানমার প্রভৃতি দেশ সফর করতে পারবে। ট্রান্স এশীয় রেলপথ পুরোপুরি চালু হয়ে গেলে রেলে আমাদের ভ্রমণের পরিধিও আরও বেড়ে যাবে। তখন আমরা হয়ত রেলে চড়ে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন, থাইল্যান্ড প্রভৃতি দেশে যেতে সক্ষম হব। এটা এখন কল্পনা হলেও একদিন এর বাস্তবায়ন অবশ্যই সম্ভব। কারণ ইউরোপে রেলযোগে সহজেই একটি দেশ থেকে অন্যদেশে যাওয়া যায়।
রেল মন্ত্রণালয় যমুনার ওপর আলাদা রেল সেতু নির্মাণের কথা ভাবছে। কারণ ইতোমধ্যে বঙ্গবন্ধু সেতুর রেললাইনের ওপর চাপ অনেক বেড়ে গেছে; এর ফলে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বেড়েছে। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, যমুনার ওপর আলাদা রেল সেতু নির্মাণ জরুরী। আধুনিক বিশ্বে ভূগর্ভস্থ রেল বা টানেল রেলের প্রতি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এই আধুনিক ‘টানেল প্রযুক্তির’ সাহায্যে রেল সংযোগ আগের চেয়ে অনেক সহজতর ও উপযোগী হয়েছে। তাই পদ্মা ও যমুনার নিচ দিয়ে সুরঙ্গপথে রেলপথ নির্মাণের কথা এখন থেকে ভাবা যেতে পারে। এটা অনেক বেশি টেকসই ও পরিবেশবান্ধব। বাংলাদেশ রেলের ট্রান্স এশিয়ান সংযোগের পরিকল্পনাকে আমরা স্বাগত জানাই।

শেয়ার