রাজারহাটে ৩০কোটি টাকা লেনদেন বেশি দামে চামড়া কিনে বিপাকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা

Jessore leather pic 02
ইন্দ্রজিৎ রায়:
সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে চামড়া কিনে বিপাকে পড়েছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ২০হাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। জেলা শহর ও গ্রাম অঞ্চল থেকে চড়া দামে ক্রয় করা চমড়া পাইকারী ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। প্রতি পিস গরুর চামড়ায় ৩’শ থেকে ৫’শ টাকায় পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে। একই অবস্থা ছাগলের চামড়ার ক্ষেত্রেও। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম চামড়ার মোকাম যশোরের রাজারহাটে গতকাল প্রথম দিন প্রায় ৩লাখ পিস গরু ও ছাগলের চামড়া উঠে। এরমধ্যে ১লাখ পিস গরু ও ২লাখ পিস ছাগল রয়েছে। যার আনুমানিক মূল্য ৩০কোটি টাকা। এরমধ্যে ২৫কোটি টাকার গরুর চামড়া ও ৫কোটি টাকার ছাগলের চামড়া রয়েছে। কিন্তু দাম নিয়ে মোটেও সন্তুষ্ট নয় ব্যবসায়ীরা।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, স্থানীয় চামড়া ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারণে তারা কাঙ্খিত দাম প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সিন্ডিকেটের আধিপত্যের কারণে জেলার বাইরে থেকে আসা পাইকারী ব্যবসায়ীরা এই বাজারে চামড়া কিনতে পারছে না। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বৃহত্তর যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন মুকুল। তিনি দাবি করেন বাজারে কোন সিন্ডিকেট নেই। এবারই চাহিদার থেকে বেশী দাম পেয়েছে ুদ্র ব্যবসায়ীরা।
শনিবার বেলা ১২টার দিকে রাজারহাট চামড়ার বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, জমজমাট চামড়া বাজারে পাইকারী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের হাকডাক চলছে। এদিন বাজারে ভালো গরুর চামড়া ৮৫টাকা থেকে ৯৫টাকা (বর্গ ফুট) , মাঝারি প্রকৃতির ৭০-৭৫টাকা (বর্গফুট) ও নি¤œমানের চামড়া ৬০-৬৫ (বর্গ ফুট) টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। ছাগলের চামড়া ৬০ থেকে ৭০টাকা (বর্গফুট) দরে বিক্রি হয়েছে। তবে সরকার এবছর গরুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করেছে ৮০টাকা ও ছাগলের চামড়া (মানভেদে) ৪৫টাকা থেকে ৫০টাকা। সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে চমড়া কিনে বিপাকে পড়েছে ুদ্র ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন বাজারে চাহিদা থাকায় চড়া দামে ক্রয় করেছেন। কিন্তু পাইকারী বাজারে সিন্ডিকেট তৈরি হওয়ায় বড় সংকটে পড়েছে তারা। কয়েকজন ুদ্র ব্যবসায়ীর সাথে কথা বলে জানা যায় তাদের হতাশার কথা।
নড়াইলের কালিয়া উপজেলার গাজীরহাট এলাকার ক্ষুদ্র চামড়া ব্যবসায়ী নীল কমল জানান, এলাকার মানুষের কাছ থেকে তিনি ৫০টি গরুর চামড়া কিনেছেন এক হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকায় প্রতি পিস (চামড়ার মানভেদে)। এ চামড়া বিক্রি করতে এসে বিপাকে পড়েছেন তিনি। নীল কমল জানান ১৭শ’ টাকায় কেনা চামড়া ১২শ’ টাকা এবং আড়াই হাজার টাকায় কেনা চামড়া সর্বোচ্চ ২২’শ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বেশিরভাগ চামড়ায় ৩০০-৫০০ টাকা পর্যন্ত লোকসান দিয়ে বিক্রি করতে হয়েছে। তিনি সুদে টাকা নিয়ে চামড়ার ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন বলেও জানান। সেই টাকা পরিশোধ করার জন্য লোকসানে হলেও বিক্রি করে দিয়েছেন।
খুলনার দিঘলিয়া এলাকার আরেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সুশান দাস অভিযোগ করেন, টেলিভিশনে দেখানো হচ্ছে ঢাকার বাজারে চামড়ার ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে। ওই বাজারের ১০০-১৩০ টাকায় চামড়ায় বিক্রির খবর শুনে আমরা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে কিনে ধরা খেয়ে গেছি। এখন বাজারে এসে দেখছি ৯৫ টাকার (বর্গ ফুট) ওপর গরুর চামড়া বিক্রি হচ্ছে না। অথচ আমরা ১০০ টাকার ওপরে দাম দিয়ে কিনেছি।
নামপ্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, রাজারহাটের পাইকারী ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে চামড়া কিনছে। তাদের সাথে আতাত ছাড়া বাইরের জেলার কোন ব্যবসায়ী চামড়া কেনার সুযোগ পাচ্ছেন না। ফলে ওই সিন্ডিকেট এক প্রকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে চামড়া ক্রয় করছে। ফলে চামড়ার বাজার দর ভালে হওয়ার সম্ভবনা থাকলেও কাঙ্খিত দাম পাচ্ছে না ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।
নামপ্রকাশ না করার শর্তে রংপুরের এক ব্যবসায়ী জানান, স্থানীয় বাজারের চামড়া ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারণে বাইরের জেলার ব্যবসায়ীর উন্মুক্ত দরকষাকষিতে চামড়া কিনতে পারছে না।
সাতক্ষীরার নলতা থেকে চামড়া বিক্রি করতে আসা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মোকছেদ আলী ও সুন্নত আলী গাজী বলেন, বাজারে চামড়া নিয়ে আসলেই টোল বাবদ ইজারাদারকে পিস প্রতি ২০ টাকা করে গুনতে হয়। তাই দাম না পেলেও বিক্রি করে আসল তুলতে হচ্ছে। মহাজনের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে ৮ লাখ টাকার চামড়া কিনেছি। টাকা পরিশোধ করতে না পারলে পালাতে হবে।
বৃহত্তর যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন মুকুল জানান, রাজারহাটের চামড়ার বাজারে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১০জেলার ২০হাজার ক্ষুদ্ ব্যবসায়ী আনুমানিক ৩লাখ পিস গরু ছাগলের চামড়া এনেছে। এই চামড়ার দাম আনুমানিক ৩০কোটি টাকা। দুপুরের মধ্যে ৬০শতাংশ বিক্রি হয়ে যায় এবং সন্ধ্যার মধ্যে বিক্রি হয়ে যায় বাকী চামড়া । ক্ষুদ্র ব্যবাসায়ীরা ন্যায্য মূল্য চামড়া বিক্রি করছেন বলে তিনি দাবি করেন।
চামড়ার বাজার সিন্ডিকেট প্রসঙ্গে বৃহত্তর যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন মুকুল বলেন, বাজারে কোন সিন্ডিকেট নেই। ব্যবসায়ী উন্মুক্তভাবে বেচাকেনা করছেন। যারা সিন্ডিকেটের অভিযোগ করেছে সেটা তাদের ব্যক্তিগত অভিমত।

শেয়ার