গার্মেন্টস শিল্পের একটি শুভলক্ষণ

নিকট অতীতে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের ওপর দিয়ে অনেক ঝড়-ঝঞ্ঝা বয়ে গেছে। নানা ঘটনা-দুর্ঘটনা আর অনাকাক্সিক্ষত টানাপোড়েনে এই শিল্প অস্তিত্ব সঙ্কটের মুখে পড়ার উপক্রম হয়। স্পেকট্রাম, তাজরীন; অতঃপর সেই ভয়াবহ মৃত্যু উপত্যকা রানা প্লাজা গার্মেন্টস শিল্পের সম্ভাবনাময় বর্ণিল দিগন্তে শনির কালো ছায়া যেন। তাজরীন ফ্যাশন্সে অগ্নিকাণ্ডে ১১২ শ্রমিকের অগ্নিদগ্ধ হওয়ার ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই সাভারের রানা প্লাজায় স্মরণকালের ভয়াবহ ধস এবং ১ হাজার ১৩২ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু, আহত আরও কয়েক হাজার হতভাগ্য গার্মেন্ট শ্রমিক ও কর্মচারী। এই ঘটনার পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স অর্জনকারী এই গার্মেন্টস খাত দেশ-বিদেশে চরম আস্থাহীনতার মধ্যে পড়ে যায়। বিদেশী বায়ারের কেউ কেউ মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্থগিত করে জিএসপি সুবিধা। অন্য বিদেশী বায়াররা তাদের রফতানি কার্যক্রম অব্যাহত রাখলেও শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর চাপ অব্যাহত রাখে।
শুধু বিদেশী বায়ারদের চাপের কারণে নয়, গার্মেন্টস খাত এবং এ খাতের শ্রমিকদের কল্যাণে অনুকূল পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে দেশ ও জাতির স্বার্থেই। পোশাক কারখানার শ্রমিকদের বর্তমান বেতন-ভাতা বাজারদর অনুপাতে সন্তোষজনক নয় বলেই তাদের মাঝে অসন্তোষ রয়েছে। তারা মজুরী বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছে কিছুদিন থেকেই, যার সুরাহা এখনও হয়নি। উল্লেখ্য, বর্তমান সরকারের আমলে শ্রমিকদের একদফা বেতন বাড়ানো হয়েছে আবারও বেতন বৃদ্ধির লক্ষ্যে মজুরী কমিশন গঠন করা হয়েছে। শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ উন্নয়নেও নেয়া হয়েছে কিছু পদক্ষেপ।
গার্মেন্ট শিল্প বেসরকারী খাতের ব্যক্তি মালিকানাধীন একটি শিল্প খাত। এখানে সরকারের ভূমিকা থাকলেও মূল ভূমিকা পালন করেন মালিকরা। তাদের ব্যবসায়িক লাভ-লোকসানের হিসাবের আলোকেই তারা শ্রমিকদের মজুরী ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দেবেন, এটা যৌক্তিক। কিন্তু শিল্পের মূল শক্তি শ্রমিকদের বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্বও তাদের। শ্রমিকদের মানবিক চাহিদা ও প্রয়োজনের দিকটা তাই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। শ্রমিক-স্বার্থকে গৌণ রেখে কোন যথার্থ ব্যবসায়িক পরিকল্পনা হতে পারে না। লাভ-লোকসানের সাকুল্য হিসাবের মধ্যে শ্রমিকদের স্বার্থের অনুকূল অনুষঙ্গ যোগ হলে এবং সেই অনুযায়ী পোশাকের মূল্য নির্ধারিত হলে শ্রমিক-মালিক কারও ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে না; এর ফলে শ্রমিক অসন্তোষেরও আশঙ্কা থাকে না। এই দ্বিবিধ বিষয়ের সুষম মেলবন্ধন হয় না বলেই গার্মেন্ট সেক্টরের অস্থিরতা নিরসন হচ্ছে না বলে প্রতীয়মান।
তবে এবারের ঈদে মালিকদের মধ্যে প্রশংসনীয় পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, এবার শতভাগ গার্মেন্টে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস দেয়া হয়েছে বলে দাবি বিজিএমইএ’র। এটি অত্যন্ত শুভলক্ষণ; যদিও বিভিন্ন স্থানে কয়েকটি কারখানায় বেতন-বোনাসের দাবিতে শ্রমিক-বিক্ষোভ হয়েছে বলে রিপোর্ট ছেপেছে। এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএ বলেছে, দু’একটি কারখানা আর্থিক সমস্যার কারণে বেতন-বোনাস দিতে সামান্য দেরি করেছে। কারখানা মালিকদের শ্রমিক-স্বার্থমুখী এই সচেতনতা ও মানবিক তাগিদ প্রশংসার দাবিদার। এভাবে শ্রমিক-স্বার্থকেন্দ্রিক অন্যান্য বিষয়ে মালিকরা সহানুভূতিশীল পদক্ষেপ গ্রহণ করলে গার্মেন্ট সেক্টরের সমস্যাবলী একদিন নিরসন হবে বলে আশা করা যায়।

শেয়ার