সিলিকন ভ্যালির যেসব বৈশিষ্ট্য এশিয়ায় নেই

Feature
সমাজের কথা ডেস্ক॥ যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের সিলিকন ভ্যালিতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যালয় অবস্থিত। এসব প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে অ্যাডোবি, এএমডি, অ্যাপল, সিসকো, ইবে, ফেইসবুক, গুগল, এইচপি, ইনটেল, এনভিডিয়া, ওরাকল, স্যানডিস্ক, সিমেনটেক ও ইয়াহু। এ ছাড়াও তুলনামূলকভাবে ছোট কয়েকশ’ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান রয়েছে এখানে।

কী বৈশিষ্ট্যের কারণে এ এলাকায় এতগুলো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান একত্রিত হয়েছে? সিলিকন ভ্যালিতে এমন কী আছে, যা এশিয়া মহাদেশে নেই?

প্রযুক্তিবিষয়ক সাইট ম্যাশএবল প্রকাশিত প্রতিবেদনের আলোকে এ ফিচারে থাকছে সিলিকন ভ্যালির সাতটি অনন্য বৈশিষ্ট্য, যা এশিয়ায় নেই।

১. নতুনকে গ্রহণ করার সংস্কৃতি

সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত নয়, এমন মানুষও প্রযুক্তি সম্পর্কিত যথেষ্ট জ্ঞান রাখে এবং নতুন জিনিস পরখ করে দেখার একটি আগ্রহ কাজে করে তাদের মধ্যে। এটিকে সিলিকন ভ্যালির বেশ পুরনো একটি প্রথা বলা চলে, তাই একে সিলিকন ভ্যালির সংস্কৃতি বললেও ভুল হবে না।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, একদল বন্ধুবান্ধব বসে আছে। তাদের কেউই প্রযুক্তির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত নয়। দেখা যাবে হঠাৎ একজন তার স্মার্টফোনটি বের করে বলছে,“এ নতুন অ্যাপটি দেখ, এটি বেশ আকর্ষণীয়”। দেখা যাবে এরপর ওই অ্যাপটি নিয়ে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়বে। সেটিতে আর কী কী থাকলে তা আরও আকর্ষণীয় হতে পারতো, এরকম আলাপ আলোচনাও হবে। এমনও হতে পারে তারা তাদের নতুন ধারণা অ্যাপ নির্মাতাকে জানানোর চেষ্টাও করবে।

এবার আসা যাক এশিয়াতে। সত্যিকার অর্থে বলতে গেলে এশিয়ার অনেক মানুষই এখনও প্রযুক্তি সম্পর্কে অনেক কিছুই জানেন না এবং নতুন জিনিস পরখ করে দেখার আগ্রহও তাদের মধ্যে প্রায় নেই বললেই চলে। এর একটি কারণ হতে পারে অর্থনৈতিক এবং সামাজিক অবস্থা। সিলিকন ভ্যালির উদাহরণ যদি এশিয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহার করি, তাহলে দেখা যাবে তাদের কথাবার্তার প্রায় অধিকাংশই প্রযুক্তিবিহীন। শুধু প্রযুক্তির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত রয়েছে এমন চক্রেই দেখা যাবে এ উৎসাহ-উদ্দীপনা।

তাই বলে এমনটা মনে করার কারণ নেই যে, এশিয়ার তরুণরা প্রযুক্তি নিয়ে ভাবেন না। তারা ভাবেন, কিন্তু তাদের সেই ভাবনা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কল্পনা পর্যন্তই থেকে যায়। বাস্তবে রূপ নেয় না। বিষয়টি এশিয়াবাসীর জন্য সত্যিই দুঃখজনক।

২. ভাগ করে নেওয়া এবং একসঙ্গে বেড়ে ওঠার ইচ্ছা

সিলিকন ভ্যালির প্রায় প্রত্যেক ব্যক্তিই একজন আরেকজনের প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধা পোষণ করেন। তারা একজন আরেকজনের বিভিন্ন বিষয়ে সাহায্য করেনন এবং প্রয়োজনে তারা জুঁটি বেঁধে একসঙ্গে কাজ করেন। এই মানসিকতা এশিয়ায় অনেকটাই অনুপস্থিত। সিলিকন ভ্যালির ভাগ করে নেওয়ার মানসিকতা তাদের লক্ষ্য পূরণে সাহায্য করে। ঠিক একইভাবে একসঙ্গে কাজ করে বেড়ে ওঠার মানসিকতাটাও তাদের লক্ষ্য পূরণের খুব কাছে নিয়ে যায়। তারা চাইলে একজন আরেকজনের ওপর নির্ভর করতে পারে। অবশ্য সিলিকন ভ্যালির সবাই যে এমন, তা নয়। তবে বেশিরভাগ মানুষই এরকম মানসিকতার। এজন্য তাদের বাধা পেরোতে কষ্ট করতে হয় কম এবং জটিল প্রকল্প খুব দ্রুত এবং সহজে বাস্তবায়ন করতে পারে।

৩. ব্যর্থতার দৃষ্টিভঙ্গি

জাপানে ডেভ ম্যাক্লুর নামের একজন বিনিয়োগকারী বলেছিলেন, “উচ্চপদস্থ কারও জনস্মুখে ব্যর্থ হওয়াটা জরুরি, যাতে অন্যরা শিখতে পারে, কাজটি কীভাবে করতে হবে।”

সিলিকন ভ্যালিতে কেউ কোনো কারণে কিছু করতে ব্যর্থ হলে, সাধারণত সে সেই ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান করে এবং ত্রুটিগুলো শুধরে প্রকল্পটি আবার শুরু করা যায় কিনা — এ বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করে। সম্ভব হলে প্রকল্পটি পুনরায় শুরু করে। কিন্তু এশিয়ায় সাধারণত বিষয়টির বিপরীত রূপ দেখা যায়। এশিয়ায় কেউ ব্যর্থ হলে সাধারণত তারা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং পরবর্তীতে প্রকল্পটি আর খতিয়ে দেখা হয় না। এশিয়ায় কেউ ব্যর্থ হতে চায় না এবং অধিকাংশ মানুষই ব্যর্থতাকে মেনে নিতে পারে না। এ বিষয়টি যতদিন এশিয়ার মানুষের মধ্যে থাকবে, ততদিন প্রযুক্তিক্ষেত্র তো অনেক দূরের কথা, সাধারণ কাজেও তারা অনেক পিছিয়ে থাকবে।

আশার কথা হচ্ছে, এশিয়ার তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এ মানসিকতটা অনেকটাই কমে আসতে শুরু করেছে। সংখ্যায় কম হলেও অনেক এশিয়ান এখন ব্যর্থতাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিচ্ছে।

৪. সাহায্যের মানসিকতা

সিলিকন ভ্যালির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, সবার সবাইকে সাহায্য করার মানসিকতা। প্রায় প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্র থেকে একে অন্যকে সহযোগিতা করে। ফলে তাদের সাফল্যের প্রতিবন্ধকতাগুলো সহজেই তারা অতিক্রম করতে পারে। কিন্তু এশিয়ায় এ বিষয়টি বেশ কম দেখা যায়। সাহায্যের ক্ষেত্রে এশিয়ার মানসিকতা এখনও অনেক পিছিয়ে আছে।

যদি আমাদের মনের গভীরে সফল হবার ইচ্ছা থাকে, তবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে একে অন্যের দিকে। একমাত্র তাহলেই সম্ভব সফলতার পথে বাধাগুলোকে অতিক্রম করা।

৫. সামঞ্জস্য

যুক্তরাষ্ট্র একটি উন্নত দেশ একথা আমরা প্রায় সবাই জানি। তাই সিলিকন ভ্যালির স্থাপনা, রাস্তা, অফিস প্রায় সব একইরকম আছে, যেমনটি ছিল পাঁচ বছর আগে। নতুন কোনো স্থাপনা হলেও তা করা হয় বেশ ভেবেচিন্তে। এর ফলে প্রয়োজনীয় সবকিছু হাতের কাছেই পাওয়া যায়। সোজা কথায় বলতে গেলে, ওদের ওখানে প্রতিটি কাজের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ বা উপাদান হাতের নাগালেই রয়েছে। ফলে খুব সহজেই ওরা কোনো প্রকল্প নিয়ে কাজ করতে পারে।

কিন্তু এশিয়াতে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অনেক কিছু থাকলেও, তা রয়েছে অপরিকল্পিত অবস্থায়। বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে। এ কারণে প্রয়োজনের সময় সবকিছু হাতের নাগালে পাওয়া যায় না। এটিও সিলিকন ভ্যালির সঙ্গে এশিয়ার বেশ বড় একটি পার্থক্য।

৬. ভ্যালির স্টার্টআপরা সমস্যা তৈরি করে সমাধানের জন্য

যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় সবকিছুই নিয়মতান্ত্রিকভাবে সম্পন্ন হয়। তাই সেখানকার স্টার্টআপ উদ্যোক্তারা প্রকল্পের নতুন নতুন সমস্যা খুঁজে বের করে এবং সমাধানের জন্য কাজ করতে পারে সহজেই। এতে করে ওরা নিত্যনতুন সমস্যার সমাধান করতে পারছে আর জন্ম দিচ্ছে নিত্যনতুন প্রযুক্তির। অন্যদিকে এশিয়ায় সমস্যার শেষ নেই। তাই চাইলেও এত সহজে স্টার্টআপ উদ্যোক্তারা নতুন সমস্যা নিয়ে কাজ করতে পারে না। আবার সমস্যা নিয়ে কাজ শুরু করলেও তার সমাধান করতে গিয়ে বেশ ঝামেলা পোহাতে হয় তাদের।

৭.স্বপ্ন

সিলিকন ভ্যালির উদ্যোক্তাদের স্বপ্ন থাকে বড় এবং তারা সে স্বপ্ন পূরণে সফলও হয়। দেখা যায়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে স্বপ্নও আরও বড় হতে থাকে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় মার্ক জাকারবার্গ এবং তার সঙ্গীদের কথা। জাকারবার্গ যখন ফেইসবুকের ধারণাটি নিয়ে আসেন এবং তা বাস্তবে রূপ দেন, তখন তারাও ছিলেন তরুণ শিক্ষার্থী। তাদের স্বপ্ন ছিল এটি সারা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা ব্যবহার করবে। তাদের সে স্বপ্ন পূরণ হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের স্বপ্ন আরও বড় হয়েছে এবং সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। সারা বিশ্বের অসংখ্য মানুষ ব্যবহার করছে ফেইসবুক।

এশিয়াকে সিলিকন ভ্যালির মতো হতে হলে পাড়ি দিতে হবে এক বিশাল পথ। মাত্র চারটি এশিয়ান শহর স্টার্টআপের পরিবেশের দিক দিয়ে উপযোগী। অবশ্য সবাই একসঙ্গে কাজ করলে এবং সিলিকন ভ্যালির বৈশিষ্ট্যগুলো অর্জন করতে পারলে হয়তো এশিয়াকেও একদিন প্রযুক্তি বিশ্বে ইউরোপের সমকক্ষ হিসেবে গণ্য করা হবে।

শেয়ার