তরুণ আর্টিস্ট আশি ভাগই অভদ্র

wahid
সমাজের কথা ডেস্ক॥
ফেরদৌস ওয়াহিদ বাংলাদেশে পপ সঙ্গীত ইতিহাসে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত একটি নাম। পপ সঙ্গীতকে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে পরিচিত এবং জনপ্রিয় করায় রেখেছেন অনবদ্য অবদান। শখের বশে হাত দিয়েছেন চলচ্চিত্র নির্মাণেও। চার দশকের সঙ্গীত ক্যারিয়ারে গেয়েছেন অসংখ্য জনপ্রিয় গান, গাইছেন এখনও। সম্প্রতি প্রকাশ পেয়েছে তার নতুন একক অ্যালবাম ‘মাধুরী’।

সঙ্গীত জীবন, চলচ্চিত্র, বর্তমান সঙ্গীতচর্চাসহ নানান বিষয়ে কথা বলেছেন বাংলানিউজের সঙ্গে। ছবি তুলেছেন নূর।

দীর্ঘদিন পর একক অ্যালবাম প্রকাশ করলেন এবার…

প্রায় ছয় বছর পর বেরিয়েছে ‘মাধুরী’ অ্যালবামটি। তবে পুরোপুরি মৌলিক গান দিয়ে সাজাইনি। চারটি মৌলিকের পাশাপাশি চারটি সংগৃহীত গানও আছে। এরমধ্যে আছে ‘একটা চাবি মাইরা’, ‘আহারে খোদার বান্দা’, ‘সাধের লাউ’ আর ‘আমায় ভাসাইলি রে’। তিন দশকের বেশি সময় আগের এইসব গান আগের ওই ফ্লেভার রেখেই রেকর্ডিং করেছি। এখন দেখি শ্রোতারা কতটা পছন্দ করেন। এটি আসলে একটি এক্সপেরিমেন্টাল অ্যালবাম।

গ্রামে কি যাওয়া হয় ?

আমি তো আসলে এখানকার(ঢাকার) মানুষ না। ট্রানজিটের মতো করে ঢাকায় থাকি। গ্রামই(মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর) আমার আসল জায়গা। ওখানেই আমার আনন্দের জগত।

শৈশব কৈশোরের বড় একটা সময় কেটেছে দেশের বাইরে। এজন্যই কি গ্রামের প্রতি আলাদা টান?

হতে পারে। সেই ১৯৬১ সাল থেকেই আমি কানাডায়। ১১ বছর ছিলাম। দেশে ফেরার পরও অত গ্রামের প্রতি টান ছিল না। গ্রামকে নিয়ে প্রথম ভাবনা আসে আমার বাবা মারা যাবার পর। আত্মীয় স্বজনদের দাওয়াত দিতে গিয়ে দেখতে পাই বাবার বসতভিটা। সেদিন ঢাকায় ফিরতে ফিরতে মাথায় ঘুরতে থাকে বাবার ভিটার কথা। তারপর থেকেই গ্রামে নিয়মিত যাওয়া শুরু। আর এখন তো রীতিমতো যা কিছু গড়েছি সব ওখানেই।

কানাডা’য় থাকা জীবন আপনার সঙ্গীতে কতটা প্রভাব ফেলেছে?

একশত ভাগ। কানাডায় না গেলে আমি পপ গানে কখনোই জড়িত হতাম না। ছোটবেলা থেকে গান শিখেছি। গানের প্রতি আগ্রহ ছিল পুরোদমেই। তবে কানাডায় গিয়ে এলভিস প্রিসলি, টম জোন্স’দের গান দেখে দেখে এ ধারার গানে মূল মনোযোগটা চলে আসে। আরেকটা ব্যাপার, আজকের বাংলাদেশে স্যাটেলাইট সংযোগে ৫০-৬০টি চ্যানেল দেখা যায়। সেই সত্তরের দশকে কানাডাতেই ৫০-৬০টি চ্যানেল আমার চোখের সামনে ছিল। ইচ্ছে হলেই ঘুরে ফিরে দেখতাম।

সদ্য স্বাধীন একটা দেশে রক পপ ধারার গান করাটা নিশ্চয়ই সহজ ছিল না…

তা তো অবশ্যই। আমি, ফিরোজ সাঁই, আজম খানরা যখন এসব গান করতাম, তখন এ দেশের অনেক সুধীজন আমাদের সমালোচনা করতেন। ‘গেল গেল’ রব তুলে আমাদেরকে সংস্কৃতি নষ্টের অপবাদ দিতেন। কিন্তু তরুণরা খুব ভালোভাবে গ্রহণ করল আমাদের গানকে। একসময় ওই সব সুধীজনরা অবস্থান পরিবর্তন করলেন। পরে তো রীতিমতো প্রশংসাও করেছেন।

বাংলাদেশের পপ সঙ্গীতের সাথে জড়িয়ে আছেন আপনি, আজম খান, ফিরোজ সাঁইদের নাম। কতটা মনে পড়ে সেসব সময়?

আজম খানকে অনেকে বলে পপস্টার। কিন্তু আমার মতে সে পপস্টার নয়, রকস্টার। বাংলাদেশে গান গেয়ে সর্বপ্রথম জনপ্রিয় হওয়া মানুষটি হচ্ছে আজম খান। তারপরে এসেছে আমার বা অন্যদের নাম। তবে আজম খান থেকেও বড় একটা ভূমিকা ছিল ফিরোজ সাঁইয়ের। একজন সংগঠকের মতো কাজ করেছেন তিনি।
তখনকার ইন্টারকন্টিনেন্টালে কিছু ছেলে গাইত, আমি বিদেশ থেকে এসেছি-ওই সব গান করতে চাই; এভাবে বিভিন্ন জায়গা থেকে সবাইকে একত্রিত করে এক কাতারে এনে পপকে পরিচিত করানোর বড় কৃতিত্ব ফিরোজ সাঁইয়ের। আর আমার ক্ষেত্রে খুব কাজ করেছে ভাগ্যের। না হলে ‘এমন একটা মা দে না’, ‘আগে যদি জানিতাম’ ‘মা মুনিয়া’ গানগুলো গাওয়া হত না, জনপ্রিয় হত না।

আপনার জনপ্রিয়তার পেছনে ভাগ্যের অবদানই বেশি?

অবশ্যই। শতভাগ ভাগ্যের কারণেই আমি আজকের ফেরদৌস ওয়াহিদ। ১৯৭৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর আমি ‘এমন একটা মা দে না’ গেয়েছি। আমি তখনো চিন্তা করি নাই, এই গানটা আমার জীবনে কী নিয়ে আসবে! আমার ছেলে হাবিব কী-ই বা করছে, আসিফও বা কী করছে, আর আমি-ই বা কী এমন করছি? ভাগ্য না থাকলে হয় না।
ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে এক মহাত্মা গান্ধীর বড় কৃতিত্ব আছে। কিন্তু ওই সময় কি মহাত্মা’র মতো চিন্তাধারার বা কাজ করার আর কেউ ছিল না? অবশ্যই ছিল। কিন্তু ভাগ্য ক্লিক করেছে মহাত্মাকে। কখন কার ভাগ্য কোথায় ক্লিক করে তা বলা যায় না। তবে এটা সত্য, ভাগ্যে থাকলেই সব হয় না। সততা, পরিশ্রম এসব দিয়ে ভাগ্যটাকে ধরে রাখতে হয়।

মাঝে এক দশকের বেশি সময় আপনি সঙ্গীতে ছিলেন না। না থাকার পেছনের কারণ কী ছিল?

কয়েকটি কারণই ছিল। যার কারণে আমি ১৯৮৮ থেকে ৯৯ পর্যন্ত এগার বছর সঙ্গীতের সাথে ছিলাম না। আমি মানুষটা নিজের জীবন নিয়ে শতভাগ খুশি। কিন্তু দুঃখ লাগে ওই এগার বছর সময় নিয়ে। ওই সময় দেশের কোন মিউজিক ডিরেক্টর বা অন্য কেউ আমাকে ডাকেননি গান করতে। গান আমি আগের মতো পারি কি পারি না- এটাও কেউ জানতে চায়নি। আমার জন্য গানে এক অন্ধকার সময় ছিল সেটি।

ফিরে এলেন কীভাবে?

আমার ছেলের মাধ্যমেই ফিরে এসেছি। ও লন্ডন গিয়ে গানে জড়িত হয়েছে। দেশে এসে আমাকে ঠেলেঠুলে গানে জড়াল। তারপর থেকে আবারো পুরোদমে অ্যালবামে, প্লে-ব্যাকে আর জিঙ্গেলে কণ্ঠ দেয়া শুরু করেছি। এভাবে চালিয়ে যাচ্ছি এখনও। গানে আমার পুনর্জন্ম ঘটিয়েছে আমার ছেলে। হাবিবের জন্ম না হলে আমি ফেরদৌস ওয়াহিদের পুনর্জন্ম হতো না।

হাবিবের সঙ্গীতে আসার পেছনে আপনার ভূমিকা কতটুকু ছিল?

আমি সচেতনভাবে চাইনি হাবিব মিউজিকে আসুক। তবে জানতাম ও মিউজিক-ই করবে। ছোটবেলায় ওর থাকার ঘরের পাশে ছিল আমার প্র্যাকটিস রুম। সেই দুই আড়াই বছর বয়স থেকেই ও গানের সংস্পর্শে ছিল। তারপর মিউজিকে ছিল, আমার কাছে গিটার চেয়েছিল। যেটি আমি দিতে পেরেছি ৯৮-তে।

তবে হাবিব যখন লন্ডনে পড়তে যাবে ও বলেছিল ব্যারিস্টারি পড়বে। আমি বলেছি তোমাকে দিয়ে এটা হবে না। তুমি মিউজিক নিয়ে পড়। কিন্তু ও বলল, না ব্যারি‌স্টারি-ই পড়ব। মজার ব্যপার ওর সাথে এ নিয়ে আমার চ্যালেঞ্জ হয়েছিল। ওখানে সিলেটিদের মুখে আবদুল করিমের গান শুনে গান করার সিন্ধান্ত নেয়। লন্ডন যাওয়ার ছয় মাস পরই আমাকে জানায় বাবা আমি ব্যারিস্টারি পড়ব না, গান নিয়ে পড়ব।

আপনি গানের মানুষ, হঠাৎ চলচ্চিত্রে?

একদম শখের বশে। মনে হল একটা চলচ্চিত্র বানিয়ে দেখি। তাই বানালাম ‘কুসুমপুরের গল্প’। আমাদের দেশে এক ধরনের কনসেপ্ট চালু আছে যে বয়স হলে আর কিছু হবে না। গানও গাইতে পারে না। আমি ব্যাপারটার সাথে একমত না।

মূলত ব্যস্ত থাকা আর নতুনত্বের স্বাদ নিতেই চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছি। অবশ্য এর আগে যে বাংলা সিনেমা নির্মাণ নিয়ে আমার খুব বেশি চিন্তা ছিল তা না। বরঞ্চ এই সিনেমাটা নির্মাণের পরই আমি সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখতে শুরু করেছি। এর আগে বাসায় টিভিতে দেখতাম। এখন যত সিনেমা মুক্তি পায় সবগুলোই দেখি।
মুক্তির পঞ্চম দিন রাত ছটা-নটার শো দেখি। খেয়াল করি পাঁচদিন পেরিয়ে এই সময়ে কতজন দর্শক সিনেমা দেখছে। আর ‘কুসুমপুরের গল্প’ আমার সিনেমা বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা দিয়েছে। ফিল্ম কী, কারা কী করবে, ক্যামেরা দিয়ে কীভাবে কোন কাজটি করতে হয় সবই শিখেছি এই সিনেমা দিয়েই।

‘কুসুমপুরের গল্প’ নিয়ে আপনি কতটা আশাবাদী?

মোটেই আশাবাদী না। কোন প্রত্যাশাও নেই। এই সিনেমাটাতে আমার চারটা বড় ভুল ছিল। প্রথমত আমি নিজেই ভুল, দ্বিতীয়ত ক্যামেরা নিয়ে জানতাম না, তৃতীয়ত আর্টিস্ট কী নেব তা নিয়ে ভাবিনি আর চতুর্থত দর্শক কী চায় তা ভাবিনি। এটা তৈরির পর বুঝেছি ভুলগুলো। অভিনয়ের অনেক বিষয় নিয়ে নতুন ধারণা হয়েছে আমার।
অভিনয় বলতে অনেকে বুঝায় সাবলীল অভিনয়। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে ন্যাচারাল হলে খুব বেশি দর্শক দেখে না। আমি স্বাভাবিক কান্না সিনেমাতে করলে তিনজনের পছন্দ হবে, বাকিদের হবে না। অভিনয় মানে আমার কাছে অভিনব কিছু, যাতে অভিনবত্ব থাকে।

নিজের অভিনয় আর পরিচালনাকে কত দেবেন আপনি?

পরিচালক হিসেবে দশ-এ দুই। আর অভিনয়ে দশ-এ আট।

অনেকেই সঙ্গীতাঙ্গনের সাথে জড়িত তরুণদের সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করছেন?

এখনকার অধিকাংশ তরুণ আর্টিস্টের আচরণ ভালো না। অন্যকে সম্মান দেয়া, নমনীয় আচরণ করা, এসব তাদের মধ্যে অনুপস্থিত। মাত্র বিশ ভাগ তরুণ আর্টিস্ট-ই ভদ্র। এবং তারা বেশ ভালো মানের ভদ্র। কিন্তু বাকি আশি ভাগই অভদ্র। সৌজন্যতাবোধ নেই। ধরাকে সরা জ্ঞান করার ভাব আছে তাদের মধ্যে।

প্রতিবছর বেরিয়ে আসছে অনেক নতুন কণ্ঠশিল্পী। তাদের নিয়ে কী বলবেন?

এসব শিল্পী আসছে অনুকরণের গান গেয়ে। বিচারকদের চেয়ে এসএমএস ভোট আবার মূল হাতিয়ার। তবু বলব গান যতদিন আছে, গাওয়ার মানুষও থাকবেই। নতুন ছেলে মেয়েরা অবশ্যই উঠে আসবে। প্রতিভা অন্বেষণ ভালো ব্যাপার, যদি চর্চা ধরে রেখে তারা নিজেদের এগিয়ে নিয়ে যায়। ক্ষণিকের জোয়ারে উঠে আসছে, টিকে থাকতে হবে নিজেকেই। সবমিলিয়ে ট্যালেন্ট হান্ট খারাপ না।

তবে বিচার কাজ নিয়ে খানিকটা কথা আছে। বিচারকের আসনে প্রাধান্য পাচ্ছে জনপ্রিয় মুখগুলো। সঙ্গীত নিয়ে প্রকৃত জ্ঞান আছে এমন অনেকে এখনো কোনো প্রতিযোগিতার বিচারক হননি। তারা পেছনের মানুষ। তাদের মানুষ কম চেনে। তাই চেনামুখই বেশি দেখা যায় বিচারকের আসনে।

সবসময় সানগ্লাস পরে থাকেন আপনি। বিশেষ কোন কারণ…?

টিভিতে প্রথম অনুষ্ঠান করার সময়কার কথা। অনেক পাওয়ারের লাইট জালানো থাকে স্টুডিও শুটিংয়ে। তখন আলোর ঝলসানিতে আমার চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল। গেলাম ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার বললেন আপনার চোখ আগে থেকেই অল্প মাইনাস আছে। আলোয় যখন পানি পড়ে তাহলে চশমা পরে নেন। তারপর যে সানগ্লাস পরা শুরু করলাম আর ছাড়িনি।

শুরুর দিকে অনেকে বলত চশমার কারণে আসল লুক আসছে না, বা অন্যরকম লাগছে। আমি ডাক্তারের দোহাই দিতাম। ব্যস, থেকে গেল। একসময় দেখা গেল আমার সাথে সানগ্লাস ব্যাপারটাই জড়িয়ে গেছে। এটি এক ধরনের স্টাইল হয়ে গেছে।

সঙ্গীত জীবনে স্বীকৃতি নিয়ে সন্তুষ্ট?

পুরোটাই। স্বীকৃতি দুভাবে হয়। পুরস্কারের মাধ্যমে এবং মানুষের ভালোবাসার মাধ্যমে। পুরস্কারের স্বীকৃতি তেমন পাইনি; এ নিয়ে অবশ্য কোনো আক্ষেপও নাই। আর মানুষের ভালোবাসার স্বীকৃতির শেষ নেই। জীবনের সম্বলও তো এটাই।

শেয়ার