ক্রিকেটের সোনার ছেলে

ধান-নদী-খাল-এই তিনে বরিশাল। বরিশালের আবহমান এ বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে আরও একটি অসাধারণ বৈশিষ্ট্যের মাত্রা যোগ হলো এবার। সেই মাত্রা এতই তুঙ্গস্পর্শী এবং আলোঝলমল যে, তা বাংলাদেশকেই শুধু আলোকিত-মহিমান্বিত করেনি; বিশ্ব পর্যায়েও তার মহিমা ও ঔজ্জ্বল্য ছড়িয়ে পড়েছে দারুণ এক সম্ভাবনা-আত্মপ্রত্যয়ের দার্ঢ্য নিয়ে। সেই প্রত্যয়পূর্ণ, ইতিহাস সৃষ্টিকারী সম্ভাবনার নাম বরিশালের সোহাগ গাজী। বাংলাদেশ ক্রিকেটের সোনার ছেলে। ক্রিকেটাঙ্গনের নতুন বিস্ময়। মাত্র বাইশ বছরের তরুণ। পাঁচ ফুট ১১ ইঞ্চি উচ্চতার শালপ্রাংশু এ তরুণ বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে এবং সেই সঙ্গে বিশ্ব ক্রিকেট ইতিহাসে এমন একটি অধ্যায় যোগ করেছেন যা সোনার অরে লেখা। বিশ্ব ক্রিকেট অঙ্গনে টেস্ট ক্রিকেটের ১৩৬ বছরের ইতিহাসে তিনিই একমাত্র ক্রিকেটার, যিনি একই সঙ্গে, একই ম্যাচে ব্যাট হাতে সেঞ্চুরি আর বল হাতে হ্যাটট্রিক করার গৌরব অর্জন করেছেন। চট্টগ্রামের জহুর আহমদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে নিউজিল্যান্ডের মতো ক্রিকেট পরাশক্তির বিরুদ্ধে সম্প্রতি তিনি এই কৃতিত্ব দেখান, যা ক্রিকেটের ইতিহাসে অনন্য রেকর্ড। টেস্ট ক্রিকেটে উইকেট শিকারে হ্যাটট্রিক কিংবা রান সংগ্রহের েেত্র সেঞ্চুরি নতুন নয়। এর আগে টেস্ট ইতিহাসে ৩৯টি হ্যাটট্রিক আর ৩ হাজার ৬৪৫টি সেঞ্চুরির রেকর্ড রয়েছে। কিন্তু তা বিচ্ছিন্নভাবে, ভিন্ন ভিন্ন ম্যাচে। একই সঙ্গে, একই ম্যাচে এমন দুর্লভ ঘটনা ইতিহাস এর আগে কখনও প্রত্য করেনি। সেই অনন্য রেকর্ডের স্রষ্টা আমাদের সোনার ছেলে সোহাগ গাজী। কোটি কোটি মানুষের সোহাগে ধন্য এই তরুণ সম্প্রতি অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম টেস্টে ব্যাট হাতে যেমন সেঞ্চুরি হাঁকান, এক দৃষ্টিনন্দন ইনিংস খেলেন তেমনি বল হাতে হ্যাটট্রিকের সঙ্গে পান ৬ উইকেট। টেস্ট ক্যারিয়ারের মাত্র সপ্তম ম্যাচে তিনি যে অনন্য কীর্তির মাইলফলক স্থাপন করলেন, তাকে আকাশচুম্বী বললেও যেন পুরোটা বলা হয় না।
টেস্ট ক্রিকেটের ১৩৬ বছরের দীর্ঘ ইতিহাসের পথপরিক্রমায় বাংলাদেশ টেস্ট ক্রিকেট একান্তই নবীন- আন্তর্জাতিক টেস্টে অভিষেক তো বলা যায় সেদিনের ঘটনা-২০০০ সালে, ভারতের বিপে প্রথম টেস্ট ম্যাচের মাধ্যমে। একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ১৯৮৬ সালে, পাকিস্তানের বিপ।ে সেই হিসেবে টেস্ট স্টাটাস প্রাপ্তি ১৪ বছর পরে ঘটলেও বিশ্বরেকর্ড গড়ার েেত্র টেস্ট ছাড়িয়ে গেছে ওয়ানডে-কে। টেস্টের এই অনন্য অর্জনের স্থপতি সোহাগ গাজী তাই জাতীয় ক্রিকেট দল এবং জাতীয় মর্যাদার প্রতীক হয়ে থাকবেন চিরকাল।
ওয়ানডে এবং টেস্ট- উভয় ক্রিকেটেই বাংলাদেশের পদচারণা ও কৃতিত্বের ধারাবাহিক ইতিহাস সন্তোষজনক। ওয়ানডে ও টেস্ট ক্রিকেটে অল রাউন্ডার হিসেবে সাকিব আল হাসান বিশ্বব্যাপী পরিচিত এক নাম। অল রাউন্ডার হিসেবে বিশ্ব-র‌্যাঙ্কিংয়ে কয়েকবার তিনি শীর্ষস্থানে ছিলেন। কিছুদিন বিরতির পর টেস্ট ক্রিকেটের অনন্য গৌরবের মুকুট আবারও তাঁর মাথায় এখন শোভা পাচ্ছে। আশরাফুল-তামিরাও বর্হিবিশ্বে পরিচিত নাম। আর এবার সোহাগ গাজীর অনন্য ইতিহাস সৃষ্টিকারী নৈপুণ্য আমাদের ক্রিকেটে যে মাত্রা যোগ করল, বিশেষ করে টেস্ট ক্রিকেটে, তা যেমন প্রত্যাশাপূর্ণ তেমনি বাংলাদেশ ক্রিকেটের তাৎপর্যপূর্ণ বাঁকবদলেরও ইঙ্গিতবাহী। আমাদের ক্রিকেটকে এবং সেই সঙ্গে ক্রিকেটারদের যথাযথভাবে লালন-পৃষ্ঠপোষণ করা হলে এই ক্রিকেট যে দেশকে, দেশের সম্মানকে কতটা উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে, তার সাম্প্রতিকতম দৃষ্টান্ত টেস্টে বিশ্ব রেকর্ড সৃষ্টিকারী সোহাগ গাজী। তাঁর এই কৃতিত্বে আমাদের ক্রিকেট কর্তৃপও সব কিছু নতুন আঙ্গিকে ভাববে এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে বলে সবার প্রত্যাশা।
অভিনন্দন সোহাগ গাজী! জয় হোক! বাংলাদেশ ক্রিকেটের।

শেয়ার