ঢাক আর কাঁশির বোলে যাদের জীবন গাঁথা

Awesome
ইন্দ্রজিৎ রায়:
ঢাকের বাদ্য, কাঁশির বোল শারদ হাওয়ায় খুশির রোল। শারদীয় দুর্গোৎসবে ঢাক আর কাঁশির বাজনা ছাড়া পূর্ণতা পায়না। ঢাক, কাঁশির বাজনা উলু, শঙ্খের ধ্বনি ও পুরোহিতের মন্ত্র উচ্চারণের মধ্যে দিয়ে শুরু হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা। মানুষের আনন্দের মাত্রা আর এক ধাপ বাড়িয়ে দিতে ঢাক ও কাঁশির বাদ্য অনবদ্য ভূমিকা পালন করে। আর যারা এই ঢাক বাজানোর কাজ করে থাকে তাদেরকে ঢাকি বলা হয়। এই ঢাকিদের জীবন জীবিকাকে ঘিরে রয়েছে নানা আনন্দ বেদনার কথা।
পূজা আসলেই ঢাকিদের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। শারদীয় দুর্গাপূজার পাঁচ দিন ছাড়াও কালীপূজা ও চৈত্র পূজা, বিয়ের অনুষ্ঠানে ঢাক ও কাঁশির বাদ্য। সময়ের বিবর্তনের আধুনিক যন্ত্রপাতির আবিস্কার হলেও ঢাক ও কাঁশির গুরুত্ব মোটেই কমেনি। এই ঢাক ও কাঁশি নামক বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে যারা জীবিকা নির্বাহ করেন তাদের অধিকাংশই হিন্দু সম্প্রদায়ের ঋষি বংশের সদস্য। তারা বংশ পরম্পরায় এটাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছে। তবে সময়ের পালাবদলে নানা পরিবর্তন হলেও তাদের কদর মোটেই কমেনি। বরং বেড়েছে। তারপরও এ পেশায় জড়িতদের অনেকেই অন্য পেশায় ঝুঁকে পড়ছে।
নড়াইলের শেখহাটি এলাকার মুকুল কুমার বিশ্বাস (৬০) প্রায় ৪০ বছর যাবৎ ঢাক বাজিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। বাবার হাত ধরেই তিনি এই পেশায় এসেছেন। তবে বছরের বারো মাস তাদের কদর না থাকলে উৎসব পার্বন ও বিয়েতে বেশ কদর বাড়ে। প্রতিবছরের ব্যবধানে বাড়ে তাদের মজুরিও। তিন ভাই ও ভাইপোসহ ৪ জনকে নিয়ে যশোর শহরের বেজপাড়া পূজা সমিতি মণ্ডপে এসেছেন। বিগত ৩৫ বছর ধরে তিনি শারদীয় দুর্গোৎসবে এই মণ্ডপে ঢাক বাজান। প্রথমদিকে তিনি বাবার সাথে আসতেন। তখন সর্বসাকল্যে তাদের দেয়া হতো মাত্র ২৫ টাকা। সময়ের বিবর্তনে বেড়েছে জীবন যাত্রার মান ও মুজুরি। এ বছর তার ৪ সদস্যের দল ১৬ হাজার টাকায় চুক্তিবদ্ধ হয়েছে।
মুকুল কুমার বিশ্বাস বলেন, ১৭-১৮ বছর বয়সেই বাবা অভিমন্যু বিশ্বাসের সাথে মন্দির থেকে মন্দিরে কাঁশি বাজাতেন। এরপর বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে ঢাক বাজাতে শেখেন। বাবার মৃত্যুর পর তিনিই একটি ঢাকির দল করেন। তার এ দলে এখন ৪ সদস্য। যেখানে যান নির্দিষ্ট টাকার চুক্তির বিনিময়ে। এক সময় এ পেশায় মজুরি কম থাকলেও বর্তমানে সম্মানজনক পাওয়া যায়।
আরেক ঢাক বাদক অজিৎ কুমার বিশ্বাস (৬২) জানান, দুর্গা পূজা ও কালীপূজার ঢাক বাজিয়ে সংসার চলে না। এই দুই পূজার বাইরেও তাদের একটি ব্যাণ্ড দল আছে। এ দল পূজা, বিয়ে, শোভাযাত্রাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। এতে তাদের সারাবছরের চলার মত উপার্জন হয়।
ঢাক বাদক মুকুল কুমার বিশ্বাসের সাথে কাঁশি বাজাতে আসা তারই ভাইপো (ভাইয়ের ছেলে) চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র সাগর বিশ্বাস (১০) জানান, পূজার ছুটিতে জ্যাঠার ( বাবার বড় ভাই) সাথে পূজায় কাঁশি বাজাতে এসেছি। অনেক মজা করছি। প্রায় প্রতিটি অনুষ্ঠানে তাদের সাথে বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ান। শুধু মুকুল কুমার বিশ্বাস কিংবা অজিৎ কুমার বিশ্বাস নয়। তাদের মত অনেকেই এ পেশায় নিয়োজিত থেকে জীবিকা নির্বাহ করছে। আবার অনেকেই ক্রমবর্ধমান চাহিদার সাথে নিজেকে খাপ খাওয়াতে না পেরে বাপ দাদার পেশা ত্যাগ করে অন্য পেশায় নিয়োজিত হয়েছেন। তবে বংশের এই পেশাকে টিকিয়ে রাখতে আকাশ বিশ্বাস হাতে কাঁশি তুলে নিয়েছে। পর্যায়ক্রমে একদিন তার জ্যাঠার মত ব্যাণ্ড পার্টির প্রধান হবেন। এক এলাকা থেকে অন্য এলাকার ভক্তদের মাতিয়ে তুলবেন ঢাকের বাদ্য, কাঁশির বোল আর বাাশির সুরে। এভাবে হাজার বছর ধরে এগিয়ে যাচ্ছে একটি সম্প্রদায়ের ইতিহাসের কাহিনী।

শেয়ার