গণহারে পাস সমস্যার সমাধান নয়

pass‘বাহ্! ভালো তো, ভালো না?’ এটি একটি মুঠোফোন কোম্পানির বিজ্ঞাপনের ভাষা। ইদানীং নানা অছিলায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এটি অনেকে ব্যবহার করেন। সম্প্রতি সম্মান প্রথম বর্ষের সব ফেল করা ছাত্রকে গণহারে পাস করিয়ে দিয়ে এই স্লোগানটির যথার্থ ব্যবহারের একটা বড় ধরনের সুযোগ করে দিল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। তা নিচ্ছেও সবাই। ফেল করেও পাস করিয়ে দেওয়ার দাবিতে সড়ক অবরোধ করে ওপরের ক্লাসে প্রমোশন পাওয়া যায়, এমন ব্যবস্থা আর কোনো দেশে আছে বলে জানা নেই। তাই তো কবি দ্বিজেন্দ্র লাল রায় তাঁর অমর গানে বলেছেন: ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি।’ নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারার এমন মোক্ষম ব্যবস্থা আর কোথায় পাওয়া যাবে? এমনকি আফ্রিকা মহাদেশের যুদ্ধবিধ্বস্ত সুদান বা ইথিওপিয়ায়ও নয়।
সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে এমন একটি কাণ্ড ঘটার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল সেই ১৯৭২ সালে। সে সময় ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেন যথাক্রমে অধ্যাপক মুজাফ্ফর আহম্মদ চৌধুরী আর অধ্যাপক ইন্নাস আলী। দুজনকেই বঙ্গবন্ধু অসম্ভব শ্রদ্ধা করতেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সব পরীক্ষার অধিকাংশ পত্রের পরীক্ষা শেষ হয়ে গেছে। কোনো কোনো বিভাগে দুই পেপার বাকি আবার কোনোটিতে এক। অন্যদিকে, বিজ্ঞান অনুষদের প্রায় সব বিভাগের ব্যবহারিক পরীক্ষা বাকি ছিল। কিছু ছাত্র, বিশেষ করে বিজ্ঞান অনুষদের ছাত্ররা দাবি তুললেন, আর কোনো পরীক্ষা তাঁরা দেবেন না। আগে যেসব পরীক্ষা হয়েছে, তা বাতিল করতে হবে। তাঁরা সবাই অটোপ্রমোশন চান। তাঁদের সংখ্যা বেশি হলে ১০ ভাগ। বাকিরা জানান, তাঁরা যথারীতি পরীক্ষা দিয়ে ফলাফল পেতে চান। এ নিয়ে ক্যাম্পাসে তুমুল উত্তেজনা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের অবস্থাও অনেকটা একই রকম, তবে তাঁদের দাবি কিছুটা আবার অদ্ভুতও। শেষ বর্ষের পরীক্ষার্থীদের দাবি, যেহেতু তাঁরা মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন, সেহেতু তাঁদের বইপত্র লুট হয়ে গেছে; সুতরাং তাঁরা আর কোনো পরীক্ষা দেবেন না। আর নিচের ক্লাসের পরীক্ষার্থীরা বললেন, তাঁরা পরীক্ষা দেবেন, তবে তা হতে হবে বইপত্র খুলে এবং পরীক্ষা যতক্ষণ ইচ্ছা ততক্ষণ দেবেন।
দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবার নিয়মিত পরীক্ষা দিয়ে যাঁরা সনদ নিতে চান, তাঁদের সঙ্গে এঁদের কয়েক দফা সংঘাতও হলো। পরীক্ষাবিরোধীরা জানিয়ে দিলেন, স্বাধীন দেশে পরীক্ষা নামের কিছু থাকবে না। সবাইকে অটোপ্রমোশন দিতে হবে। দুই উপাচার্য জানান, তাঁরা এই অযৌক্তিক দাবি মেনে নেবেন না। অধ্যাপক মুজাফ্ফর আহম্মদ জানান, তাঁর মৃতদেহের ওপর দিয়ে এই অটোপ্রমোশন হবে। শেষ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের সবাইকে ব্যবহারিক পরীক্ষা দিয়ে ফলাফল পেতে হয়েছিল আর কলা, সমাজবিজ্ঞান ও বাণিজ্য অনুষদে যাঁরা অনার্স পরীক্ষায় এক বা দুই পেপার বাকি ছিল, তাঁদের সব পরীক্ষা ঠিক রেখে ওই অবস্থায় মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেকেই তাঁদের মতো করে কোনো পরিদর্শক বা শিক্ষকের উপস্থিতি ব্যতিরেকে পরীক্ষা দিয়েছিলেন। পরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সেসব পরীক্ষা বাতিল করে আবার পরীক্ষার ব্যবস্থা করে। একটি বিকল্প রাখে যে যাঁরা সম্পূর্ণ পরীক্ষাটা মৌখিক দিতে চান, তাঁরা তা দিতে পারেন। সেই সুযোগও কেউ কেউ গ্রহণ করেছিলেন। পরীক্ষা ছাড়া পাস তা ছিল অসম্ভব। কারণ, উপাচার্যরা ছিলেন তাঁদের সিদ্ধান্তে অটল। প্রায় চার দশক পর এসব কথা মনে পড়ল সম্প্রতি ফেল করা ছাত্রদের দাবির মুখে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক তাঁদের প্রথম বর্ষ থেকে দ্বিতীয় বর্ষে প্রমোশন দেওয়ার অভাবনীয় ঘোষণার পর। এই পরীক্ষার্থীদের সংখ্যা মোট পরীক্ষার্থীর ৪৬ শতাংশ, সংখ্যায় প্রায় এক লাখ। এই ‘মেধাবীদের’ অনেকেই একদিন বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে রাষ্ট্রের প্রথম শ্রেণীর আধিকারিক হবেন। বাহ্! ভালো তো, ভালো না?
এই ফেল করা ‘মেধাবী’ শিক্ষার্থীরা বলছেন, নতুন গ্রেড-পদ্ধতির কারণেই নাকি তাঁরা ফেল করেছেন। আগে ৩৩ নম্বর পেলে তাঁরা পাস করতেন, গ্রেড-পদ্ধতিতে পেতে হবে ন্যূনপক্ষে ৪০। এই তথ্যটি তাঁরা আগে থেকেই জানতেন না, এমন নয়। সুযোগ পেলেই আমরা সবাই সমস্বরে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে একহাত নিই এই বলে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে এগুলো কতগুলো সনদ বিক্রির দোকান। এখন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ও কী এদের ক্লাবে ভর্তি হলো এই ফেল করা ছাত্রদের আন্দোলনের ভয়ে সবাইকে পাস ঘোষণা করে? জানি, এই ধরনের কর্মকাণ্ডকে হালাল করার জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তাব্যক্তিরা নানা ধরনের অজুহাত দাঁড় করাবেন। একজন সহ-উপাচার্য জানান, ফলাফল বিপর্যয়ের জন্য দায়ী পরীক্ষকেরা, এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
কী অদ্ভুত যুক্তি! এই যে সনাতনপদ্ধতি থেকে গ্রেড-পদ্ধতিতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় যাচ্ছে, তা কি শিক্ষকেরা জানতেন না? না যদি জেনে থাকেন, তাহলে সে দায়দায়িত্ব কার? বেশির ভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে (যেগুলো তথাকথিত সনদ বিক্রির দোকান, সেগুলো বাদে) কোনো বিষয়ে ৭০-এর কম নম্বর পেলে ফেল অবধারিত এবং কারও যদি জিপিএ-২-এর নিচে আসে, তাহলে সেই ছাত্র ওই সেমিস্টারে ফেল করবেন এবং দুবার ফেল করলে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত হবেন। এক বছরে তাঁকে কমপক্ষে নয়টি বিষয় পড়তে হয় (তিন সেমিস্টার-পদ্ধতিতে)। ছাত্র ভালো হলে কখনো কখনো তাঁরা এই তিন সেমিস্টারে ১০ থেকে ১২টি কোর্সও শেষ করেন। আর যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ছয় মাসের সেমিস্টার, সেখানে বছরে পড়তে হয় ১০টি। সাধারণ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও একই নিয়ম।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দু-একজন কর্মকর্তা জানান, এই সিদ্ধান্তটি তাঁরা নিতে বাধ্য হয়েছেন। কারণ, এই রমজান মাসে তাঁরা চাননি এই ফেল করা ছাত্রদের আন্দোলনে সাধারণ মানুষের কষ্ট হোক। এমন বক্তব্য বালখিল্য ছাড়া আর কিছু নয়। তাঁরা মনে করেছিলেন, ঘটনা এখানেই বুঝি থেমে যাবে। কথায় আছে, বাঙালিকে বসতে দিলে শুতে চায়। এখানেও ঠিক তেমনটি হয়েছে। যেই-না জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় দ্বিতীয় বর্ষে উত্তীর্ণের শর্ত শিথিল করল, ঠিক পরদিন ন্যূনতম গ্রেড-পদ্ধতি বাতিলসহ চার দফা দাবি নিয়ে চট্টগ্রামে বিক্ষোভ মিছিল করেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা। তাঁদের দাবি, শুধু প্রথম বর্ষ থেকে দ্বিতীয় বর্ষ নয়, দ্বিতীয় বর্ষ থেকে অন্যান্য বর্ষে প্রমোশনের জন্য যে সর্বনিম্ন গ্রেড পয়েন্ট নির্ধারণ করা হয়েছে, তা-ও বাতিল করতে হবে। একই সঙ্গে তাঁরা আরও কিছু দাবি-দাওয়াও উপস্থাপন করেছেন। এরপর হয়তো দাবি উঠবে পরীক্ষাটরীক্ষা বাদ। বছর শেষে সবাইকে পাস ঘোষণা করতে হবে এবং সনদটা বাড়িতে পৌঁছে দিতে হবে। এঁরাই একদিন দাবি করবেন, তাঁরা দেশের শ্রেষ্ঠ ‘মেধাবী’। সুতরাং সব সরকারি চাকরি তাঁদের জন্য সংরক্ষিত রাখতে হবে।
বিরোধীদলীয় নেতা কম যান কিসে? প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিলেন, বিসিএসে কোটাপদ্ধতি বাতিলের দাবিতে যারা ভাঙচুর করেছে, ভিডিও ফুটেজ দেখে তাদের নিয়োগ থেকে বাদ দেওয়া হবে। এটি তাঁর বলার প্রয়োজন ছিল না। প্রথম কথা হচ্ছে, যাঁরা কোটাপ্রথা বাতিলের দাবিতে ভাঙচুরসহ নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছেন, তাঁদের মধ্যে কজন প্রকৃত বিসিএস পরীক্ষার্থী ছিলেন, তা প্রশ্ন সাপেক্ষে। এরপর প্রকৃত মেধাবীরা এই ধরনের নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে পারেন, তা বিশ্বাস হয় না। এই নৈরাজ্যের প্রেক্ষাপটে যখন পাবলিক সার্ভিস কমিশন ফলাফল পুনর্বিবেচনা করল, তখন দেখা গেল, প্রথম তালিকায় স্থান পাওয়া আদিবাসী গোষ্ঠীর অনেক উত্তীর্ণ হওয়া পরীক্ষার্থী বাদ পড়েছেন। এই পরীক্ষার্থীরা কোনো রকম নৈরাজ্য সৃষ্টি না করে বাদ পড়ার প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছেন। এতে কি কোনো কাজ হবে? না হলে তাঁরাও যদি ভাঙচুর আর নৈরাজ্যের আশ্রয় নেন, তাহলে তাঁদের কি কোনো দোষ দেওয়া যাবে। কারণ, দেশে তো এখন এই সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত যে ভাঙচুর না করলে দাবি পূরণ হয় না। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য লুফে নিয়ে সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন; ক্ষমতায় গেলে তিনি যাঁরা বাদ পড়বেন, তাঁদের সবাইকে চাকরি দেবেন। এটি একটি দায়িত্বজ্ঞানহীন উক্তি। পাবলিক সার্ভিস কমিশনের একজন সাবেক চেয়ারম্যান সেদিন এক টিভি টক শোয় জানান, চারদলীয় জোট সরকারের আমলে মন্ত্রীরা অনেক সময় কিছু নামের একটা তালিকা ধরিয়ে দিয়ে তাঁদের চাকরি দিতে নির্দেশ দিতেন। সুতরাং বিএনপি ক্ষমতায় এসে এই সংস্কৃতি আবার চালু করলে দেশের আমলাতন্ত্রের কফিনে সর্বশেষ পেরেকটা ঠোকা শেষ হবে।
বাংলাদেশে পাবলিক পরীক্ষা নিয়ে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। এ কারণে ফলাফল যে তেমন একটা ভালো হয়েছে, তা কিন্তু নয়। শিক্ষার প্রসার হয়েছে ঠিক, কিন্তু তার যে গুণগত মানের তেমন একটা উন্নতি হয়েছে, তা আমার ৪০ বছরের শিক্ষকতা জীবনে কখনো মনে হয়নি। এই অবস্থা থেকে উত্তরণ না হলে আমরা আগামী দিনে যেমন বাংলাদেশ চাই, তা কখনো পাওয়া যাবে না। আর প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে বাংলাদেশের তরুণেরা ক্রমাগত পিছিয়ে পড়বেন। পদ্ধতি আর প্রক্রিয়ার ত্রুটি থাকলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উচিত গণহারে পাসের ব্যবস্থা না করে সেসব ত্রুটি দূর করার ব্যবস্থা করা। আর আমার তরুণ বন্ধুদের বলি, কেন নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারার এমন পথ বেছে নিল তারা?
আবদুল মান্নান: সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

শেয়ার