নির্মাণের এক বছরের মাথায় ফাটল!

bkmhallঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হল’-এর নবনির্মিত সিকদার মনোয়ারা ভবনের বিভিন্ন কক্ষে ফাটল দেখা দিয়েছে। ভবনটি চালু হওয়ার এক বছরের মাথায় এ ফাটল দেখা দেওয়ায় ভবনে অবস্থানরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
ভবনটিতে ১২০ জন ছাত্রী ও চারজন শিক্ষক থাকেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে ভবনটি থেকে সবাইকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ তিনটি কক্ষ থেকে ছাত্রীদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন সূত্রে জানা যায়, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান সিকদার গ্রুপ বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলের এই বর্ধিত ভবনটি তৈরি করে দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান জয়নুল হক সিকদার তাঁর স্ত্রীর নামে ভবনের নামকরণ করা হবে এমন শর্তে অর্থ সহায়তা দেন। শর্ত অনুযায়ী ভবনটির নামও রাখা হয়েছে ‘সিকদার মনোয়ারা ভবন’। ২০০৬ সালে সিকদার গ্রুপের মনোনীত প্রতিনিধি হিসেবে কামরুল অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস ভবনের নির্মাণকাজ শুরু করে। আটতলা ভিতের এ ভবনটির তিনতলা পর্যন্ত নির্মাণ শেষ হয় ২০১২ সালে।
ভবনটি ঘুরে দেখা যায়, ভবনের তৃতীয় তলায় ছাত্রীদের থাকার কক্ষগুলোর মধ্যে তিনটি কক্ষে (৩৩৩, ৩৩৪, ৩৩৫) ফাটল দেখা দিয়েছে। দ্বিতীয় তলায় এক আবাসিক শিক্ষকের বাসায় ছাদ চুইয়ে নোংরা পানি পড়ছে। এ ছাড়া যেদিকে ভবনের টয়লেটগুলোর অবস্থান সেখানেও বড় বড় বেশ কয়েকটি ফাটল দেখা দিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী মফিজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ভবনটি পরিদর্শন করে বুয়েটের শিক্ষকেরা ‘নিম্নমানের নির্মাণ ও ত্রুটিজনিত নকশার’ কারণে এ ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর ভাষ্য, ভবনটির নির্মাণের সঙ্গে তাঁদের কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনগুলোর নকশা একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি দিয়ে অনুমোদন করানো হয়। কিন্তু এ ভবনটির ক্ষেত্রে তা করা হয়নি।
সূত্র জানায়, ভবন নির্মাণের জন্য সিকদার গ্রুপ ২০০৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে এক কোটি টাকা দেয়। তৎকালীন প্রাধ্যক্ষ তাহমিনা আখতার সেই টাকা নিয়ে ভবনের নির্মাণকাজ শুরু করেন। ২০০৮ সালে হলের দায়িত্ব নেন বর্তমান প্রাধ্যক্ষ ফরিদা বেগম। ফরিদা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ভবনের তিনতলার ছাদ নির্মাণের পর তিনি হলের দায়িত্ব নেন। এরপর দীর্ঘদিন ভবনটির নির্মাণকাজ বন্ধ ছিল। অনেক তাগাদা দেওয়ার পর ২০১২ সালে নির্মাণকাজ শেষ হয়। ভবনটি ছাত্রীদের থাকার জন্য উপযুক্ত কি না, তা খতিয়ে দেখার জন্য তৎকালীন কোষাধ্যক্ষকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু কমিটি প্রতিবেদন দেওয়ার আগেই ছাত্রীদের চাপের মুখে ভবনটির দায়িত্ব হল কর্তৃপক্ষ বুঝে নেয়।
গত বছরের মে মাসে ভবনটি চালু হয়। ভবনটির তৃতীয় তলায় ছাত্রীদের জন্য ১৫টি কক্ষ রয়েছে। প্রতিটি কক্ষে আটজন করে ছাত্রী থাকেন। দ্বিতীয় তলায় রয়েছে রিডিং রুম, চারজন আবাসিক শিক্ষকের বাসা। নিচতলায় রয়েছে একটি হল ইউনিয়ন কক্ষ, একটি নামাজের ঘর।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী মফিজুল ইসলাম বলেন, ভবনটির নকশা খুবই নিম্নমানের। ‘ক্যান্টিলিভার স্ল্যাব’ দিয়ে টয়লেট বানানো হয়েছে।
পুরো বিষয়টি তদন্ত করে দেখার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) সহিদ আকতার হুসাইনকে প্রধান করে একটি তথ্যানুসন্ধান কমিটি গঠন করেছে। সহিদ আকতার হুসাইন প্রথম আলোকে বলেন, একজন ডিপ্লোমা প্রকৌশলীর নকশা দিয়ে ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞ দল প্রাথমিকভাবে ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ বলে অভিমত দিয়েছে। ইতিমধ্যে ছাত্রীদের সরিয়ে নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে পুরো ভবনটিই অনিয়মের মধ্য দিয়ে হয়েছে।
ভবন নির্মাণের সঙ্গে জড়িত কামরুল অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের কামরুল হুদা বলেন, ভবন নির্মাণের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশলীদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ভবনের দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে কিন্তু নির্মাণ কাঠামোতে কোনো ফাটল দেখা দেয়নি। তাই এটি কোনো ঝুঁকির কারণ হতে পারে না।
সাবেক প্রাধ্যক্ষ তাহমিনা আখতার বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সব ধরনের সংশ্লিষ্টতায় ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে।

শেয়ার