১৯শে মে ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৫ই জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
শব্দবারুদের কারিগর কবি সৈয়দ আহসান কবীর
213 বার পঠিত

মিলন রহমান

কলম নিয়ে যখন কাটাকাটি খেলার বয়স; তখনই কলম নিয়ে বর্ণ, শব্দের খেলায় মেতেছি আমরা। এভাবে সাহিত্যের পবিত্র জমিনে আমাদের বিচরণ শুরু। স্কুলের বইটানা টিনের বাক্সে গড়ে ওঠে ‘আমাদের লাইব্রেরি’ নামে লাইব্রেরি। তখন তৃতীয় কি চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ি। স্কুলের কয়েকজন বড় ভাইয়ের উদ্যোগের সঙ্গে আমাদের চলতে থাকা। সে লাইব্রেরিকে ঘিরে জমে ওঠে গ্রন্থপাঠ। পেয়ে বসে বই কিনে পড়ার নেশা। কৈশরে পা দিয়ে বিদ্যালয় প্রঙ্গনে সাহিত্যচর্চায় আরও বেশি উদ্যোমী হয়ে উঠি। যশোর জিলা স্কুলের বার্ষিক ম্যাগাজিন ‘জাগরণ’-এ প্রকাশ পায় আমাদের লেখালেখি। দেয়ালিকা ‘প্রয়াস’ হয়ে ওঠে লেখনির অন্যতম স্থান। কয়েক বন্ধুর সম্পাদনায় প্রকাশ পায় ভিন্ন ভিন্ন সাহিত্যম্যাগ। তাদের মধ্যে শূন্য দশক মাতানো কবি, বন্ধুবর সৈয়দ আহসান কবীরের লেখা আমাকে দোলা দেয়। তার কবিতায় শব্দের খেলায় বসে আলো-আঁধারির মেলা, পাঠক-পাঠিকার হৃদয়ে তোলে শব্দের ছান্দিক কম্পন। কবি তার লেখায় উপমা আর অলঙ্করণে দ্রোহ আর প্রেমকে একই বিন্দুতে মিলিয়ে এঁকেছেন বৃত্ত; গড়েছেন কাব্যস্বর্গ। যে স্বর্গে কাব্যচর্চা যেন প্রার্থনাসম!

আশাভরা জমিন গড়তে তার উদাত্ত আহ্বান কাছে টেনে নেয়। ‘অথচ পাখিরা ডানা মেলে দেয়’ কাব্যগ্রন্থের ‘মনের মনিব’ কবিতায় কবি সৈয়দ আহসান কবীর লিখেছেন, ‘ওই যে দূরের নীল ছাতাটার ছঁই খুলে নে,/আর না হলে ফের ফিরে আয়/সবুজছোঁয়া রোদ-গালিচায়;/পিঠের সাথে পিঠ-পরশে দিগন্তের ওই স্বপ্নগুলো/এক রেখাতে আঁকতে থাকি,/আলতো রোদে গ্লাস ভরে মধুর পরশ খুব ছড়িয়ে/মনসহ ওই মেঘ গুলে খাই; কষ্টরা সব আলোয় ভাসুক,/তুই-আমিতে মন ফিরে পাই…।’ একই গ্রন্থে তার কলমকে গর্জে উঠতে দেখেছি ‘ভালোবাসায় মুছে যাক রাউলাট আইন’ শিরোনামের কবিতায়। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘জালিয়ানওয়ালাবাগ প্রতিশোধ নিক/রেগিনাল্ড ডায়ারের শব কেটে ছিড়ে,/মুছে যাক রাউলাট আইনের নাম/তোমার আমার এই ভালোবাসা ভিড়ে।’

প্রেমময় আশাজাগানিয়া অথচ দ্রোহের পঙক্তি তার লেখাতে বারবার ঘুরে ফিরে ভর করতে দেখেছি। তার কলমে মাঝে মাঝে শব্দবারুদ খুঁজে পেয়েছি। পেয়েছি আগুনজ্বলা পঙক্তিÑ ‘সুখাদ্যে রুচি নেই/আমি এখন আগুন খাবো/নিশ্বাসে বেরুবে হাইড্রক্সিল শিখা/বাতাশে ভাসবে বারুদের গন্ধ।/…/আমি আগুন খেয়ে পাড়বো আগুনের ডিম/যেনো এক ফুৎকারে নিভিয়ে দিতে না পারে/আমার যতো অতীত-বর্তমান।/আমি আগুনে পুড়িয়ে গড়বো আলোকিত স্বপ্ন/যা তেতে হবে খাঁটি সোনালি ভবিষ্যৎ।’ [কাব্যগ্রন্থ: হৃদয়ের সিন্কহোল, কবিতা: আলোকিত ভবিষ্যৎ]
বেদনায় জেগে ওঠা আক্ষেপে কবি সৈয়দ আহসান কবীরের মধ্যে জন্ম নিয়েছে ‘অদ্ভুত মনো-মেইল’। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘ভূতুড়ে আমি তো নই, পৃথিবী তাহলে ক্যানো?/তবে কি ভুল কোর-এ ভুল ছায়াপথে/ জন্ম আমার অদ্ভুতুড়েÑ/জমাট বাঁধা এন্টার্কটিকায়?/না কি বিষুবীয় বায়ুপথে ঝুলে থাকা স্মৃতিকথা অদ্ভুত?’ [কাব্যগ্রন্থ : অথচ পাখিরা ডানা মেলে দেয়]

শব্দের খেলা আর উপমা-অলঙ্করণে শূন্যদশকের কবিদের মধ্যে সৈয়দ আহসান কবীরকে পেয়েছি অন্যতম হিসাবে। রূপকের আদলে দ্রোহ, ভালোবাসার কাব্যিকতায় সমাজ, ঐতিহাসিক কথামালায় সময়, মিথ উপস্থাপনে বাক্যবাণ তৈরিতে তার তপস্যা খুবই স্পষ্ট। কবি প্রায়ই বলেন, ‘শব্দরা বড্ড অভিমানী, ধরা দিলেই কাছে টেনে নিতে হয়। কবিতার পবিত্র অঙ্গনে আমাদের কিছু দায় আছে। সে দায় দায়সারা যেন না হয়ে যায়।’ আমার মনে হয়, শব্দের সঙ্গে কবির প্রেম ও কবিতার সঙ্গে কবির দায়বদ্ধতা তাকে বাঁচিয়ে রাখবে।

‘স্বপ্নরঙিন সুখ’ কবিতায় তিনি লিখেছেন, ‘বৃষ্টিতে ধুয়ে যাক কালোমাখা রাত, মুছে যাক যতো সব পোড়া-জ্বলা দিন/আমার শুধুই চাইÑ জোছনা আলো, রূপালি রঙেতে ভেজা চাঁদ অমলিন।’ এতো চমৎকার পঙক্তিগুচ্ছ তার কলমে উঠে আসাটাই স্বাভাবিক। যদিও তার লেখা গল্প কবিতায় ইংরেজি শব্দের ব্যবহার লক্ষণীয়; ব্যবহৃত হয়েছে বিজ্ঞানময় শব্দ। যেগুলোর অর্থ সাধারণ পাঠকের কাছে অপরিচিত। তবে কবিতা পাঠতে মনে হয়েছে, সংশ্লিষ্ট পঙক্তিতে ওই সব শব্দরা অপরিহার্য হয়ে ধরা দিয়েছে।

‘দুপুর রোদে স্যাডো-সেলাই’ কবিতায় সুকান্তীয় চিন্তার ছাপ ধরা দিতে দিতে নিজের মুনশিয়ানায় তা উড়িয়ে দিয়ে সৈয়দ আহসান কবীর গড়েছেন নতুন সৌরভ। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘দুপুরের রোদে পোড়া মানুষের মন যেনো/তপ্ত উনুনে সেঁকা তন্দুরী রুটি/শিক কাবাবের এক সুস্বাদু মেনু,/মামা হালিমে শেষ চুমুকের মতো/রাজনীতির হোটেল-সেরা কস্তুরী বনÑ/ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায় তাই শকুনের দল।’ [কাব্যগ্রন্থ : হৃদয়ের সিন্কহোল]। একইভাবে বাস্তবতা তুলে ধরতে সাহসীর ভূমিকায় দেখেছি কবিকে। লিখেছেন ‘কথিত প্রগতিই সভ্যতার কাল হবে যেভাবে হয়েছে ধমান্ধতা’ শিরোনামে কবিতা। পরে তা আমাদের আরেক বাল্যবন্ধু, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কবি শেখ মেহেদী হাসান ইংরেজিতে ভাষান্তর করেন। যা আমেরিকার একটি সাহিত্যপোর্টালে প্রকাশ পায়। কবিতাটি ভূয়েসী প্রশংসা কুড়ায়।

সম্পাদক ও প্রকাশক : শাহীন চাকলাদার  |  ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আমিনুর রহমান মামুন।
১৩৬, গোহাটা রোড, লোহাপট্টি, যশোর।
ফোন : বার্তা বিভাগ : ০১৭১১-১৮২০২১, ০২৪৭৭৭৬৬৪২৭, ০১৭১২-৬১১৭০৭, বিজ্ঞাপন : ০১৭১১-১৮৬৫৪৩
Email : samajerkatha@gmail.com
পুরাতন খবর
FriSatSunMonTueWedThu
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31 
স্বত্ব © samajerkatha :- ২০২০-২০২২
crossmenu linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram