২৫শে মে ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ১১ই জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
শুরু হয়েছে বজ্রনিরোধক দণ্ড নির্মাণ
আতঙ্কের নাম বজ্রপাত , যশোরে ১০ দিনে মৃত্যু ৪

বিশেষ প্রতিনিধি : বজ্রপাত প্রবণ এলাকা না হলেও যশোরে মৃত্যু আতঙ্ক বাড়ছে। গত ১০ দিনে ৪ কৃষক মারা গেছেন। যাদের পরিবারকে প্রশাসনের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণও দেয়া হয়েছে। বিগত বছরগুলোতে বজ্রপাত প্রতিরোধে রোপিত তালগাছ ‘অদৃশ্যমান’ হয়ে গেছে। অবশ্য তালগাছ বর্ধন সময় সাপেক্ষ হওয়ায় শুরু হয়েছে বজ্রনিরোধক দণ্ড নির্মাণ। ইতোমধ্যে যশোর হাসপাতালে ও কেশবপুরে দুটি দণ্ড স্থাপন করা হয়েছে। টিআর কাবিখার অর্থে পর্যায়ক্রমে আরো দণ্ড স্থাপন করা হবে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

যশোর জেলা প্রশাসনের ত্রাণ শাখার পরিসংখ্যান বলছে ২০১৫, ২০১৬ ও ২০১৭ সালে বজ্রপাতে যশোরে মারা গেছেন ২৩ জন। ২০১৬ সাল থেকে তালবীজ লাগানোর প্রকল্প গৃহীত হয়। জেলায় লাখ লাখ তালবীজ রোপণ করা হয়েছে। এখনও টিআর কাবিখার মাধ্যমে যশোরে প্রতিবছর গড়ে ১০/১১ হাজার তালবীজ রোপণ করা হচ্ছে। তবে সুফলপ্রাপ্তি সময় সাপেক্ষ হওয়ায় সরকার ওই প্রকল্প থেকে সরে এখন বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন প্রকল্পে হাত দিয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, সারা দেশে বজ্রপাতে প্রতিবছর গড়ে ১৬৫ জন মানুষের মৃত্যু হয়। কিন্তু বজ্রপাত প্রতিরোধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। বিভিন্ন সময় বজ্রপাত নিরোধে নানা প্রকল্প গ্রহণ হলেও দৃশ্যত কোনো অগ্রগতির খবর কেউ বলতে পারে না। এসব প্রকল্পে অর্থের ব্যয় হলেও বজ্রপাতে মৃত্যু ঠেকানো যাচ্ছে না।

এবারও ঝড় বৃষ্টির মৌসুম শুরু হওয়ার সাথে সাথেই শুরু হয়েছে বজ্রপাত। প্রচণ্ড তাপদাহের পর বৃষ্টি প্রশান্তি না এনে বজ্রপাতের আতঙ্ক নিয়ে এসেছে। বৃষ্টি আর ঝড় হলেই বজ্রপাতে একাধিক মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে। গত ২৩ এপ্রিল পূর্বাঞ্চলের ছয়টি উপজেলায় একদিনে বজ্রপাতে ৯ জন প্রাণ হারান। এরপর ২৭ এপ্রিল একদিনে ছয় জেলায় বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন ৮ জন । এভাবে প্রতিদিনই বজ্রপাতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।

ফিনল্যান্ড ভিত্তিক বজ্রপাত বিষয়ক গবেষণা সংস্থা ভাইসালার তথ্যমতে, বজ্রপাতে যারা মারা যান, তাদের ৭০ ভাগই কৃষক বা যারা খোলা মাঠে কাজ করেন। এছাড়া বাড়ি ফেরার পথে ১৪ শতাংশ এবং গোসল ও মাছ ধরার সময় ১৩ শতাংশ বজ্রপাতের ফলে মৃত্যু হয়েছে।

যশোর বজ্রপাত প্রবণ এলাকা না হওয়ায় সঠিক কোনো পরিসংখ্যান কোথাও সংরক্ষিত হয় না। জানা গেছে, জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিস বজ্রপাতে নিহতদের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা সহায়তা দিয়ে থাকে। সেখানে চলতি বছর ইতোমধ্যে ৪জনের মৃত্যুর রেকর্ড রয়েছে। অফিসটিতে সংরক্ষিত তথ্যে জানা গেছে, জেলায় ২০১৫ সালে ৯ জন, ২০১৬ সালে ৭ জন এবং ২০১৭ সালে বজ্রপাতে ৭ জনসহ মোট ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। তারপরের বছরগুলোর কোনো পরিসংখ্যান নেই।

এদিকে বজ্রপাত নিরোধে সরকারি উদ্যোগ হিসেবে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ রিজিবুল ইসলাম জানান, ২০১৬ সাল থেকে বজ্রপাত নিরোধে তালবীজ রোপণ কর্মসূচি শুরু হয়। তবে এপর্যন্ত জেলায় মোট কত তালবীজ রোপিত হয়েছে সে পরিসংখ্যান তার কাছে নেই। তার মতে, এই তালবীজ রোপণ বেশিরভাগই স্বেচ্ছাশ্রম ও সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে হয়েছে। তবে প্রতিবছর টিআর কাবিখা বা কাবিটার আওতায় প্রতি উপজেলায় ২-৩ হাজার তালবীজ লাগানোর নিয়ম রয়েছে। যেখানে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে রাস্তার কাজ হবে সেখানে মাটির রাস্তার পাশে তালবীজ রোপণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সে হিসেবে গত ২০২১-২২ অর্থ বছরে ৩ পর্যায়ে বরাদ্দে ১০ হাজার ৯৭১টি তালবীজ রোপণ করা হয়েছে।

এর আগে ২০২০-২১ অর্থ বছরে একদিনে অভয়নগরে ৫ লাখ তালবীজ রোপিত হয়েছিল এবং অনুরূপ একদিনে কেশবপুরে ৪ লাখের অধিক তালবীজ রোপিত হয়। এসময় তিনি স্বীকার করেন, তালগাছ দৃশ্যমান হতে কমপক্ষে বীজ লাগানোর পর ২ বছর সময় লাগে। তাই এখনো সেভাবে তালগাছ দেখা যাচ্ছে না। তালগাছ সবচেয়ে উঁচু হয়ে থাকে। বজ্রপাত নিরোধে গাছটি কার্যকর। কিন্তু গাছটি বড় হতে অনেক সময় নেয়।

সূত্রমতে, ২০১৬ সাল থেকে বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে গ্রহণ করা হয়। তালবীজ লাগানো কর্মসূচি আপাতত খুববেশি কার্যকরী না হওয়ায় গত বছর থেকে বিল ও হাওড় এলাকায় বজ্রপাত নিরোধ দণ্ড স্থাপন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। প্রতিটি দণ্ড স্থাপনে খরচ ৬ লাখ টাকা। এই প্রকল্পে অগ্রাধিকার পায়নি যশোর জেলা। এমনকি খুলনা, মাগুরা, ঝিনাইদহ বা কুষ্টিয়া জেলাও নেই অগ্রাধিকারের তালিকায়।

এই প্রকল্প প্রধানত হাওড় এলাকায় পরিচালিত হচ্ছে। তবে যশোরের কেশবপুর উপজেলার মজিদপুরে একটি দণ্ড স্থাপন করা হয়েছে। যশোর হাসপাতালেও স্থাপন করা হয়েছে এ দণ্ড। খুব শিগগিরই ঝিকরগাছায়ও একটি স্থাপন করা হবে। এই দণ্ড শুধু বজ্রপাত নিরোধে কাজ করবে না, ওই এলাকায় কতগুলো বজ্রপাত হলো তারও রেকর্ড রাখবে দণ্ডের মাথায় লাগানো বিশেষ যন্ত্রটি।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিবছর বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। শহরে বেশিরভাগ ভবনে বজ্রনিরোধক দণ্ড থাকায় বজ্রপাতে মৃত্যু তেমন হয় না। কিন্তু গ্রামে তা না থাকা ও বড় গাছপালা কমে গিয়ে খোলা মাঠের কারণে সেখানে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি হচ্ছে। তাদের কথা বৃক্ষহীন এলাকায় বজ্রপাতে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি।
বজ্রপাতের ধর্ম হচ্ছে তা মাটিতে আঘাত হানার আগে সবচেয়ে উঁচু যে জায়গাটি পায়, সেখানে গিয়ে পড়ে। বৃক্ষহীন এলাকায় কৃষকের শরীরই মাটির চেয়ে উঁচু থাকে। তাই বজ্রপাতের সময় মাঠে বা খোলা জায়গায় যেখানে উঁচু কোনো গাছ নেই বা বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা নেই সেখানে যারা থাকেন তারা এর শিকার হন।

যশোরের সুধীসমাজের কয়েকজন জানান, চলতি বছর যেভাবে তাপপ্রবাহ ও খরা হয়েছে তা অস্বাভাবিক। এপ্রিলে তাপমাত্রা ৪৩ ডিগ্রি ছুঁয়েছিল। এই তাপমাত্রা বৃদ্ধি বজ্রপাতের প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার আতঙ্ককে সামনে আনে। তাছাড়া মুষলধারে একটানা বৃষ্টি না হলে বজ্রপাতের প্রবণতা থাকে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তাও জানান, যশোরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মার্চের শেষ থেকে বজ্রপাতের আশঙ্কা তৈরি হয় এবং তা জুন পর্যন্তই থাকে। তবে এপ্রিল মাস সবচেয়ে বজ্রপাত প্রবণ মাস বলেও জানান তিনি।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের দেয়া তথ্যানুযায়ী প্রতিবছর বাংলাদেশে গড়ে বজ্রপাতে কমবেশি ২৬৫ জনের মৃত্যু হয়। গত একযুগে তিন হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছেন। ২০২১ সালে মারা গেছে ৩৬৩ জন, ২০২০ সালে ২৩৬ জন, ২০১৯ সালে ১৬৮ জন, ২০১৮ সালে ৩৫৯ জন, ২০১৭ সালে ৩০১ জন, ২০১৬ সালে ২০৫ জন এবং ২০১৫ সালে ১৬০ মারা গেছেন। প্রতিবছর মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।

সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্টর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরামের গবেষণা সেলের প্রধান আবদুল আলীম একটি সংবাদ মাধ্যমকে জানান,‘বজ্রপাত বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ দুইটি। বৈশ্বিক উষ্ণতা বেড়ে যাওয়া এবং বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে গাছ বিশেষ করে মাঠের উঁচু গাছ কেটে ফেলা। হাওড় অঞ্চলের মাঠে আগেও তেমন গাছ ছিল না। এখন অন্যান্য এলাকার গাছও কেটে ফেলা হয়েছে। ফলে মাঠে বা খোলা জায়গায় যে সব মানুষ থাকেন বজ্রপাতের এক কিলোমিটারের মধ্যে বিদ্যুৎ পরিবাহী উঁচু জিনিস হিসেবে সেই মানুষকেই পায়। মানুষ না থাকলে মাঠের গবাদি পশু। ফলে মানুষ মারা যায়, গবাদি পশুও মারা যায়।’

তার পরামর্শ হলো, ‘আকাশে কালো মেঘ দেখা দিলে বা ঝড় বৃষ্টি শুরুর সংকেত পাওয়া গেলে মানুষকে এমন কোনো স্থাপনায় আশ্রয় নিতে হবে যা বিদ্যুৎ কুপরিবাহী। কোনোভাবেই গাছের নিচে আশ্রয় নেয়া যাবে না। কারণ গাছ বিদ্যুৎ পরিবাহী। গাছের নিচে আশ্রয় নিলে গাছের বিদ্যুৎ মানুষকে আক্রান্ত করবে।’

বাংলাদেশে বজ্রপাত প্রতিরোধ ও মানুষের জীবন বাঁচাতে সারাদেশে ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে এক কোটি তাল গাছের চারা রোপণের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিলো সরকার। এরমধ্যে সারাদেশে ৩৮ লাখ চারা রোপণের পর দেখা যায় তা এক বছরের মধ্যেই অযতেœ অবহেলায় মারা যায়। এই পরিকল্পনা যথার্থ ছিলো না বলে মনে করেন আব্দুল আলীম। কারণ তালগাছ রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াও এগুলো বড় হয়ে মানুষের চেয়ে উঁচু হতে ২০-৩০ বছর সময় লেগে যায়। তার মতে এখন প্রয়োজন হলো, ‘ফাঁকা জায়গাগুলোতে আশ্রয়কেন্দ্র এবং টাওয়ার স্থাপন করা। টাওয়ারের উপরে লাইটিনিং প্রটেকশন সিস্টেম বসাতে হবে। এর দুইটি পদ্ধতি আছে লাইটিনিং অ্যারেস্টর ও এয়ার টার্মিনাল। অল্প সময়ে সহজ পদ্ধতি হলো বজ্র নিরোধক দণ্ড। এগুলো বসাতে হবে। দীর্ঘ পরিকল্পনায় তাল গাছ, নারকেল গাছ লাগানো যেতে পারে।’

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান একটি সংবাদ মাধ্যমে বলেন, তালগাছ প্রকল্প আমরা বাতিল করেছি। এটা কোনো ফল দেয়নি। আর তালগাছ বড় হতে অনেক বছর সময় লাগে। এখন আমরা লাইটিনিং অ্যারেস্টারসহ লাইটিনিং শেল্টার নির্মাণ এবং আর্লি ওয়ার্নিং ফর লাইটিনিং, সাইক্লোন অ্যান্ড ফ্লড-এই দুইটি প্রকল্প হাতে নিয়েছি। এই প্রকল্পের জন্যে এক হাজার ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এর বাইরে বজ্রপাতপ্রবণ ১৫টি জেলায় লাইটিনিং অ্যারেস্টার স্থাপন করেছি। গত বছর টিআর-কাবিখার প্রজেক্টের অর্থ দিয়ে আমরা এগুলো স্থাপন করেছি। পর্যায়ক্রমে আরো বজ্রপাতপ্রবণ জেলায় এগুলো বসানো হবে।

সম্পাদক ও প্রকাশক : শাহীন চাকলাদার  |  ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আমিনুর রহমান মামুন।
১৩৬, গোহাটা রোড, লোহাপট্টি, যশোর।
ফোন : বার্তা বিভাগ : ০১৭১১-১৮২০২১, ০২৪৭৭৭৬৬৪২৭, ০১৭১২-৬১১৭০৭, বিজ্ঞাপন : ০১৭১১-১৮৬৫৪৩
Email : samajerkatha@gmail.com
পুরাতন খবর
FriSatSunMonTueWedThu
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31 
স্বত্ব © samajerkatha :- ২০২০-২০২২
crossmenu linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram