২রা মার্চ ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ১৮ই ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ
যশোরের ১৩ লাখ খেজুর গাছে রস হয় না

মনিরুজ্জামান মনির : কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী যশোরে ১৬ লাখ ২৫ হাজার ৩৫০টি খেজুর গাছ থাকলেও রস সংগ্রহ হয় ৩ লাখ ২১ হাজার ৮২৩টি থেকে। বাকি ১৩ লাখ গাছই রস সংগ্রহের বাইরে আছে। গাছ ছোট হওয়া ও গাছি কমে যাওয়া এর প্রধান কারণ। এর বাইরে সবচেয়ে আশঙ্কাজনক তথ্য হচ্ছে বিগত পাঁচ বছরে খেজুর গাছ কমেছে ৫০ হাজার, গাছি কমেছে দেড় হাজার। গাছ এবং গাছি কমে যাওয়ায় ৫৫ লাখ লিটার রস আহরণ কম হয়েছে। ফলে ১ লাখ ৫০ হাজার গুড়ের উৎপাদনও কমে গেছে। এভাবে ক্রমান্বয়ে ‘হারিয়ে যাচ্ছে যশোরের যশ, খেজুরের রস।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৯ সালে যশোর জেলায় মোট খেজুর গাছ ছিল ১৬ লাখ ৬২ হাজার ৪৭৫টি। এরমধ্যে ৩ লাখ ৭১ হাজার ৪৬৫টি গাছ থেকে রস সংগৃহীত হতো। গাছি ছিলো ৬ হাজার ৮৫০। প্রতিটা গাছ থেকে রস উৎপাদন হয়েছে গড়ে ১২৫ কেজি এবং গাছ প্রতি গুড় উৎপাদন হয় ১৩ কেজি।

২০২০ সালে মোট খেজুর গাছ ছিল ১৬ লাখ ৫৯ হাজার ৭৫০টি। রস সংগ্রহ হয়েছিল ৩ লাখ ৬৭ হাজার ৫৬০টি। গাছির সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ৭২০ জন। প্রতিটা গাছ থেকে রস উৎপাদন ১২৫ লিটার এবং গাছ প্রতি গুড় উৎপাদন হয় ১২ কেজি।

২০২১ সালে খেজুর গাছ কমে হয় ১৬ লাখ ৫৩ হাজার ২৭৫টি। রস সংগ্রহের গাছের সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৫২ হাজার ৪৩৫টি। গাছির সংখ্যা কমে হয় ৫ হাজার ৫৩০ জন। প্রতিটা গাছ থেকে রস উৎপাদন হয় গড়ে ১২০ লিটার এবং গুড় উৎপাদন হয় ১৩ কেজি।

২০২২ সালে মোট খেজুর গাছ আরো কমে হয় ১৬ লাখ ৪১ হাজার ১৫৫টি। আর রস সংগ্রহের গাছের সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৯৫৫ টি। গাছির সংখ্যা ৫ হাজার ১৫০ জন। প্রতিটা গাছ থেকে রস উৎপাদন ১২০ লিটার এবং গুড় উৎপাদন হচ্ছে ১২ কেজি।

২০১৯ থেকে ২০২৩ এ ৫ বছরে গাছের সংখ্যা কমে হয়েছে ১৬ লাখ ২৫ হাজার ৩৫০টি। এরমধ্যে রস সংগৃহীত হচ্ছে ৩ লাখ ২১ হাজার ৮২৩ টি গাছ থেকে। গাছির সংখ্যা কমে হয়েছে ৫ হাজার ৫০ জন। প্রতিটা গাছ থেকে রস উৎপাদন হয় গড়ে ১১৪ লিটার, প্রতিটি গাছ থেকে গুড় উৎপাদন হয় গড়ে ১০ কেজি। ৫ বছরে রসের উৎপাদন কমেছে ৫৫ লাখ লিটার এ সময়ে গুড়ের উৎপাদন কমেছে এক লাখ ৫০ হাজার কেজি।

জেলায় সবচেয়ে বেশি রস গুড় উৎপাদন হয় বাঘারপাড়া উপজেলায়। সেখানকার চিত্রও আশঙ্কাজনক। বাঘারপাড়া উপজেলায় পূর্ন বয়স্ক খেজুর গাছ রয়েছে ৫ লাখ ৫৪ হাজার , রস আহরনকারি গাছের সংখ্যা মাত্র ৪৫ হাজার, গাছির সংখ্যা ১ হাজার ৪৫ জন, রস উৎপাদন ৫০ হাজার লিটার।

যশোর সদরের লেবুতলার গাছি অলিয়ার রহমান জানান, যত সমস্যা খেজুর গাছে। দু’বছর আগেও রাস্তা করার সময়ও অনেক খেজুর গাছ মারা পড়ে।

লাউখালী গ্রামের গাছি আব্দুস সালাম জানান, ‘আমার গ্রামের খেজুর গাছ প্রায় শেষ। আমি হাপানিয়া গ্রামের মাঠের খেজুর গাছ কাটি। মোট মাঠ কুড়িয়ে ১’শ গাছে রস হয়। আগের সেই বড় কোন গাছ নেই। বড় গাছে রস বেশি হয়, মিষ্টিও হয়। বড় গাছ না থাকায় রসের পরিমাণ কম হচ্ছে।

হাঁপানিয়া গ্রামের হাসান আলী জানান, রাস্তার দু’পাশ দিয়ে কিছু গাছ আছে। তাছাড়া জমির আইলের উপর এখন আর গাছ নেই। মাঠের সেই ৫০—৬০ বছর বয়েসের গাছ আর নেই। এ কারণে রসও অনেক কম।

গাছি মোজাফ্ফর হোসেন জানান, গাছ কাটার মানুষ নেই। এখন সবাই গাছে উঠতে ভয় পায়। ২—৩ বছর আগে গাছ কাটার অভাবে মাঠে অনেক খেজুর গাছ পড়ে থাকতো। তবে বর্তমানে মাঠে খেজুর গাছ নেই বলতেই হয়।

কৃষক রেজাউল করিম জানান, খেজুর গাছের বাগান নষ্ট হয়েছে ইট ভাটার কারণে। ৮—১০ বছর আগে মাঠের প্রতিটা আইলে এবং জমির মাঝেও খেজুর গাছ ছিলো। এখন আমাদের মোট মাঠে ১শ গাছ নেই।

যশোর জেলা কৃষি অধিদপ্তারের উপপরিচালক ড. সুশান্ত কুমার তরফদার বলেন, সাধারণত কৃষক খেজুর গাছের বাগান করতে চাই না। কারণ গাছ থেকে রস সংগ্রহ করার মধ্যে অনেক জটিলতা রয়েছে। আমরা এ জটিলতাকে আধুনিকায়ন করতে প্রষ্টোয় আছি। এদিকে গাছের মালিকরাও গাছ থেকে রস আহরণ করে না।

অন্য মানুষ দিয়ে করায়। এ জন্য উভয়ের লাভের পরিমাণও কম হয়। যার কারণে গাছির পরিমাণও কমে যাচ্ছে। আমাদের কৃষি বিভাগ থেকে প্রতিত জমিতে খেজুর গাছ লাগানোর জন্য কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হয়। আবার সরকারি ভাবেও গাছিদের প্রণোদনা দেওয়া হচেচ্ছ। এ প্রণোদনা চালু থাকলেও কৃষক উদ্বুদ্ধ হবে।

তবে বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় রাস্তার দু’পার্শ দিয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং বন বিভাগ খেজুরের চারা রোপন করে। এ চারা দেখা বা পরিচর্যার দায়িত্বও তাদের। গুড় উৎপাদন করে কৃষক যেহেতু কিছুটা লাভবান হচ্ছে। আশা করি গাছের পরিমাণও আর তেমন বেশি কমবে না।

বাঘারপাড়া (যশোর) প্রতিনিধি হুমায়ুন কবির জানান, বাঘারপাড়ায় চাহিদা অনুযায়ি রস গুড় পাটালি মিলছেনা।

রস গুড়ের এলাকা হিসেবে পরিচিত খাজুরা বাজার, ছাতিয়ানতলা ও নারিকেলবাড়িয়া বাজারে গুড়ের আকাল যাচ্ছে। এখন চাহিদা অনুযায়ি গুড় পাটালি পাওয়া যাচ্ছে না।
উপজেলার শালবরাট গ্রামের সাখাওয়াত হোসেন বলেন, এক যুগের বেশি সময় ধরে খেজুর গাছ কাটছি, আগে এক সময় একশ থেকে দেড়শ গাছ কাটতাম।

কিন্তু এখন গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় প্রতি মৌসুমে ৩০ থেকে ৩৫ টি গাছ কাটছি। তিনি আরো বলেন, এক ভাড় রস ৩০০ টাকা, এক কেজি পাটালি ৪০০টাকা। তারপরও লোকজনের চাহিদা অনুসারে ঠিকমতো দিতে পারি না। তিনি আরো বলেন, গাছ বেশি হলে প্রতি মৌসুমে লাখ টাকা আয় করা সম্ভব।

বাগডাঙ্গা গ্রামের এরশাদ আলী বলেন, এক সময় অনেকগুলো গাছ কাটতাম। এখন ৮০ টার মত গাছ কাটি। তা থেকে যে রস হয় তা এলাকায় লোকজনের চাহিদাপুরন সম্ভব হচ্ছে না।

এলাকার একাধিক ব্যক্তির সাথে কথা বলে জানাগেছে, খেজুরের রস পর্যাপ্ত না থাকায় এখন অধিকাংশ জায়গায় চিনি মিশ্রিত গুড়—পাটালি বিক্রি হয়। খেজুর রসের অভাবে গ্রাম অঞ্চলের মহিলারা এখন রসের বদলে চিনি ও পানি মিশিয়ে ভিজা পিঠা তৈরি করছে।

উপজেলায় কৃষি কর্মকর্তা সাইয়েদা নাসরিন জাহান বলেন, উপজেলায় রস আহরনকারি গাছের সংখ্যা ৪৫ হাজার। যা চাহিদার তুলনায় খুবই কম । তাই এই গাছের সংখ্যা আরো বৃদ্ধি করতে সবাইকে খেজুর গাছ বেশি বেশি রোপন করতে হবে। পাশাপাশি যে গাছগুলো আছে সেগুলো নির্বিচারে কর্তন না করে পরিচর্যা করা প্রয়োজন। তাহলেই খেজুর গাছের মাধ্যমে চাহিদা পুরণ সম্ভব।

মণিরামপুরের নেংগুড়াহাট প্রতিনিধি জানান, গত কয়েক বছর গাছি সংকটে অসংখ্য খেজুর গাছ রস উৎপাদনের বাইরে ছিল। ফলে ওইসব গাছ জ্বালানি হিসেবে বিক্রি হয়ে গেছে। এক সময় প্রতিটি গ্রামে ৮ থেকে ১০জন পেশাদার গাছি পাওয়া যেত, এখন আর সে দিন নেই। গাছিদের পেশা বদল, নতুন করে কেউ গাছি না হওয়ায় সংকট দেখা দিয়েছে। তারপরও যারা আছেন তারা অতীতের মত পটু না। রস সংগ্রহকারী ভাল গাছি নেই, গাছির অভাবে বেশিরভাগ গাছে রস সংগ্রহ হচ্ছে না।

চালুয়াহাটি গ্রামের মশিয়ার মোড়ল, নওয়ালি মোড়লসহ অনেকেই বলেন, ৩০থেকে ৩৫বছর ধরে খেজুর গাছ কেটে রস বের করছি। আগের মতো এলাকায় খেজুর গাছ নেই। আর খেজুর গাছ কেটে এখন পেট চলে না, বয়স হয়েছে, তাই গাছির পেশা ছেড়ে দিতে চাই কিন্তু শীত এলেই নেষায় পড়ে কাটি।

হায়াতপুর গ্রামের গাছি আব্বাস বলেন,গাছির পেশায় সংসার চলে না, তাই এখন ওসব বাদ দিয়ে মাঠের কাজে নেমেছি।

চালুয়াহাটি ইউনিয়ানের লক্ষাণপুর গ্রামের গাছি বজলু গাজী বলেন,প্রায় ১৫থেকে ২০বছর যাবত আমি এই পেশাতে আছি। আগে আমার নিজের প্রায় শতাধিক খেজুর গাছ ছিল। রসের মৌসুমে গ্রামের আরো তিনজন পেশাদার গাছিকে সাথে নিয়ে রসগুড় তৈরি করতাম। সে—সব গাছি পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। রক্ষণাবেক্ষণ আর গাছির অভাবে আমার গাছ কমতে কমতে এখন মাত্র ৫০থেকে ৬০টি গাছ আছে। নিজেদের রস ও গুড়ের চাহিদা মেটাতে শুধু নিজেই এখন কাজ করি।

আটঘরা গ্রামের গছি আঃ সালাম মোল¬া (ভোলা) ২৫থেকে ৩০বছর ধরে গাছির পেশায় আছেন, তার বাবাও একজন গাছি ছিলেন। আশপাশে তিনি আর কোন গাছি পান না।

গাছি মশিয়ার মোড়ল বলেন, ১৫ থেকে ২০বছর ধরে এ পেশা আঁকড়ে ধরে আছি। তবে আগের মতো আর পেশাদার হিসেবে নয়, শৌখিন গাছি হিসেবে অল্প কিছু গাছ কেটে রস বের করছি।

গাছি আয়ুব হোসেন বলেন,আগের মতো এলাকায় খেজুর গাছ নেই, যার কারণে বেশিরভাগ গাছি এই পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। শীত আসলেই সকালে খেজুরের রস এবং মুড়ি ছিল গ্রামের একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার। তখন ১ কেজি খেজুরের গুড়ের দাম ছিল ৩০ থেকে ৪০টাকা বর্তমানে বাজারে ১কেজি গুড়ের মূল্য ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা। তখন গুড় বিক্রি করে চলতো গাছিদের সংসার, দুপুর হলেই গাছিরা হাঁড়ি নিয়ে ছুটে যেতেন গ্রামের বিভিন্ন পাড়া মহল¬ায়।

গাছিরা বলেন, এখন আর আগের মতো খেজুর গাছ নেই, রস ও গুড়ের চাহিদাও মেটে না। খেজুর গাছ রসের উপযোগী করে তৈরি করতে নতুন গাছি প্রয়োজন। একই সাথে গাছ কাটার উপকরণ বিশেষ করে মোট দড়ার পরিবর্তে চামড়ার বেল্ট সরবরাহ করা উচিৎ। এছাড়া সহজে গাছে চড়ার জন্য বিশেষ জুতো হলে ভালো হয়।

সম্পাদক ও প্রকাশক : শাহীন চাকলাদার  |  ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আমিনুর রহমান মামুন।
১৩৬, গোহাটা রোড, লোহাপট্টি, যশোর।
ফোন : বার্তা বিভাগ : ০১৭১১-১৮২০২১, ০২৪৭৭৭৬৬৪২৭, ০১৭১২-৬১১৭০৭, বিজ্ঞাপন : ০১৭১১-১৮৬৫৪৩
Email : samajerkatha@gmail.com
পুরাতন খবর
FriSatSunMonTueWedThu
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031 
স্বত্ব © samajerkatha :- ২০২০-২০২২
crossmenu linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram