১৯শে জুন ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৫ই আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
খেজুরের গুড়-পাটালিতে ভেজাল কারবার
খেজুরের গুড়-পাটালিতে ভেজাল কারবার

মনিরুজ্জামান মনির : খেজুরের রস গুড়ে দেশ জুড়ে খ্যাতি যশোরের। শীত মৌসুমে যশোরের গুড়ের দিকে চেয়ে থাকে দেশের মানুষ। বিদেশে অবস্থানরত বাঙ্গালিদের কাছে সমান কদর রয়েছে গুড়ের। যশোরের গুড়ের এ সুনাম ও চাহিদাকে পুঁজি করে এক শ্রেণির অসাধু চালাচ্ছে ভেজাল কারবার। ভেজালের প্রভাব এতটায় গভিরে যে, আসল গুড় চিনতে এক প্রকার ধাঁধায় পড়তে হয় ক্রেতাদের। তবে বেশিরভাগ গুড় পাটালি ঐতিহ্য মেনেই তৈরি হচ্ছে। ক্রেতারা একটু সচেতন হলেই চিনতে পারবে খাঁটি গুড়। সমাজের কথার অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এসব চিত্র।

সুখ্যাত পাটালি তৈরি হয় খাজুরার বাউনডাঙ্গায়। সুস্বাদু ও রসালো এ পাটালি তৈরিতে গাছিরা মুন্সিয়ানার পাশাপাশি চিনির ব্যবহার করে থাকেন। ভেজাল হিসেবে নয় উপকরণ হিসেবে যৎসামান্য চিনি না মেশালে এ বিশেষ পাটালি তৈরি করা যায় না বলে জানিয়েছেন গাছিরা। আবার বীজ মারতে (জমাট গুড় বা পাটালি তৈরির কৌশল) কখনো কখনো চিনি ব্যবহারের প্রয়োজন হয়।

বেশি মুনাফা প্রত্যাশী গাছিরা অধিকহারে চিনি মিশিয়ে গুড়ের পরিমাণ বাড়িয়ে দেন। এতে নষ্ট হয় গুড়ের গুণাগুণ ও স্বাদ। তবে খাঁটি গুড়ে ভেজাল হিসেবে চিনির চেয়ে বেশি মেশানো হয় দোকাট গুগ বা টকগুড়। কখনো কখনো গুড় সাদা করতে ফিটকিরি, ইউরিয়া সার; রসের পরিমাণ বাড়াতে বিচালি ভেজানো পানি, চুনের পানি, গুড় ‘খাঁটি’ বানাতে ফুড কালার ও গুড়ের সেন্ট মেশানোর তথ্য মিলেছে গাছিদের কাছ থেকে। গাছিরা বলছেন, তারা খাঁটি গুড়ই তৈরি করতে চান। তবে ক্রেতাদের ভিন্ন ভিন্ন চাহিদা ও দাম কম দেয়ার মানসিকতার জন্য গুড়ের সাথে চিনি কিংবা অন্য কিছু মেশানো হয়।

যশোরের বাজারে এক ভাড়(৪ কেজি) জিরেন রস (টাককা রস) বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২৫০ টাকায়। এক কেজি গুড় তৈরি করতে ৮ কেজি(দুই ভাড়) রসের প্রয়োজন হয়। দুই ভাড় রসের দাম ৫০০ টাকা। কিন্তু মানসম্মত এক কেজি গুড় বিক্রি হচ্ছে সাড়ে তিনশ টাকায়। শুধু রসে গুড় হয় এর সাথে যোগ হয় জ্বালানি ও গাছির পরিশ্রম। এ হিসেবে গুড় তৈরি করে বিক্রির চেয়ে রস বিক্রি লাভজনক। তারপরেও গাছি গুড় তেরি করছে ও তুলনামূলক কম দামে বিক্রি করছে। রসের চেয়ে গুড়ের দাম তুলনামূলক কম হওয়াটা স্বাভাবিক নয়।

বাউনডাঙ্গার গাছিরা জানিয়েছে ‘খাজুরার মোটা পাটালি তৈরিতে কিছু পরিমাণ চিনি ব্যবহার না করলে জমাতে সমস্যা হয়। এই পাটালিতে চিনি ব্যবহার না করলে সুস্বাদুও হয় না। খাটি গুড় ও পাটালি কালচে বর্ণের হয়ে থাকে। ক্রেতাদের নজর কাড়তে পাটালি সাদা করতে সাধারণত হাতের পরিমাপে রস জ্বালানোর সময় ফিটকিরি মেশানো হয়।’


অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসিছে, কতিপয় গাছি অধিক মুনাফার জন্য বেশি পরিমাণে চিনি ব্যবহার করছেন। কখনো কখনো চিনির পরিমাণ গুড়ের সমান হচ্ছে। কয়েক জন গাছির ঘরে বস্থা ভরা চিনিও দেখা গেছে। কেউ কেউ রাতের আধারে চিনি পানিতে ভিজিয়ে রাখে। রসের রঙ চড়াতে বিচালি ভোজানো পানিও মেশানো হয়।


কাশিমপুর গ্রামের গাছি আমিন বিশ্বাস জানান, খাটি গুড়-পাটালি একটু কালচে বর্ণের হয়ে থাকে। এ পাটালি বেশি দিন থাকে না। আগের মতো এখন আর বাগান নেই যার কারণে রস জ্বালানোর কাঠও নেই। বাজারের চিনি দেওয়া সাদা পাটালি অনেক দিন থাকে। চিনি দেওয়া পাটালি ২’শ টাকা কেজি দরে বিক্রি করলেও তাদের লাভ হয়। কারণ দুই ঠিলে রস জ্বালানোর পরে ১ কেজি মতো পাটালি হয়। আর যারা চিনি ব্যবহার করে তারা দুই ঠিলে রসে ২-৩ কেজি পাটালি তৈরি করে। ভেজাল পাটালি-গুড়ের কারণে ক্রেতাদের মনে কোন আস্থা নেই। অনেকের খাঁটি গুড় দেখানোর পরে চিনতে পারে না। যার কারণে আসল পাটালি-গুড় বিক্রি করতে আমাদের অনেক সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।

হাঁপানিয়া গ্রামের আলম হোসেন জানান, আমরা খাঁটি গুড় তৈরি করি। ভেজাল কিভাবে তৈরি করতে হয় সেটায় বুঝি না। আমাদের গুড় অর্ডার নিয়ে শেষ করতে পারি না। গুড় সাধারণত ২৫০-৩’শ টাকা কেজি দরে বিক্রি করি। ভেজাল গুড়ে বাজার ছেয়ে গেছে, দাম বেশি হলে বিক্রি হচ্ছে না তাই কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। বর্তমানে জিনিস-পত্রের দাম হিসেব করলে গুড়ের দাম অনেক কম। কারণ সকাল থেকে দুপুর ১টা পর্যšত্ম মাঠে কাজ করলে কৃষাণকে দিতে হয় ৪-৫’শ টাকা। গুড় তৈরিতে পরিশ্রমের হিসেব করলে অনেক লোকসান। তাছাড়া উচ্ছে করলেই প্রতিদিন রস পাওয়া যায় না। খাঁটি জিরেন রস পেতে খেজুর গাছকে বিশ্রাম দিতে হয়।


গাছিদের সাথে কথা বলে জানা গেছে খাঁটি পাটালি আগুল দিয়ে চাপ দিলে নরম হবে। শক্ত হলে বুঝতে হবে কিছু মেশানো আছে। গুড় যদি একটু বেশি চকচকে হয়, রস ভালো ছিল না নতুবা কিছু মেশানো। ভালো গুড়ের রং সব সময় গাঢ় খয়েরি বা একটু কালচে অথবা গাঢ় বাদামি রঙের। গুড়ের রং যত হালকা হবে বুঝতে হবে ভেজাল আছে। নতুন গুড়ে নুনতা স্বাদ থাকে না। তাছাড়া গুড় গালে দিলে যদি কচকচ করে তবে চিনি মেশানো আছে বুঝতে হবে। আসল গুড় মুখে দিলেই গলে যায়।


বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার বর্ননা মতে ফিটকিরি সবচেয়ে স¯ত্মা, কার্যকর, উপযুক্ত জীবাণুনাশক ওষুধ। বেশি পরিমাণে ফিটকিরি খেলে পেটের ব্যাথা বা বিষক্রিয়া হকে পারে।
বৃহত্তর কুষ্টিয়া ও যশোর অঞ্চল কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের অতিরিক্ত উপপরিচালক সেলিম হোসেন বলেন, আমাদের দেশে পাটালি-গুড়ে ভেজালের বিভিন্ন ধরণ রয়েছে। এগুলোতে আমাদের শরীরের জন্য বড় ধরনের ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু যশোর জেলার কৃষক বা গাছিদের মধ্যে দেখা যায় তারা পাটালি-গুড়ে ব্যবহার করে চিনি। যা মানব দেহের জন্য ড়্গতিকর নয়। তবে পাটালি-গুড়ের আসল স্বাদ ভিন্নতা তৈরি করে। মানুষ টাকা দিয়ে যে জিনিস পেতে চায় সেটা পাচ্ছে না। ক্রেতারা নিয়মিত প্রতারনা শিকার হচ্ছে।

তিনি ব্এলেন, টা বড় ধরনের প্রতারনা। তাই আমরা গাছিদের নৈতিকতা অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ইতোমধ্যে জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য বিভিন্ন জায়গায় গাছিদের বাড়িতে প্রদর্শনী হিসেবে চুলা তৈরি করা হয়েছে। পাটালি-গুড়ের ভেজাল মুক্ত করার জন্য অনেক কৃষকদের শপথ করানো হয়। অনেক কৃষক আমাকে বলে স্যার ১ কেজি গুড় তৈরি করতে ৭-৮ কেজি রস লাগে। কিন্তু এ গুড় বাজারে নিয়ে ২’শ থেকে আড়াই’শ টাকা বিক্রি করি এবং যারা চিনি মেশায় তারাও একই দামে বিক্রয় করে। আমরা সেই গাছিদের বলে থাকি মানুষের মনের আস্থা তৈরি করতে একটু সময় লাগে। আবার অনেক কৃষক আছে যারা খাঁটি গুড়-পাটালি তৈরি করছে। অনেক সময় ভেজালের কারণে খাটি গুড়-পাটালি বিক্রয় করতে সমস্যায় পড়ে। কিন্তু খাঁটি গুড়-পাটালি তৈরিতে মানুষের মনে আস্থা হলে তখন আর কৃষক সরবরাহ দিয়ে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন মানুষের মনের আস্থা তৈরি করা।

সম্পাদক ও প্রকাশক : শাহীন চাকলাদার  |  ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আমিনুর রহমান মামুন।
১৩৬, গোহাটা রোড, লোহাপট্টি, যশোর।
ফোন : বার্তা বিভাগ : ০১৭১১-১৮২০২১, ০২৪৭৭৭৬৬৪২৭, ০১৭১২-৬১১৭০৭, বিজ্ঞাপন : ০১৭১১-১৮৬৫৪৩
Email : samajerkatha@gmail.com
পুরাতন খবর
FriSatSunMonTueWedThu
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930 
স্বত্ব © samajerkatha :- ২০২০-২০২২
crossmenu linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram