১৯শে জুন ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৫ই আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে কথা বলছেন ড. ইউনুস
আজ আমি অভিশপ্ত জীবনের শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছেছি : ড. মুহাম্মদ ইউনূস

সমাজের কথা ডেস্ক : আদালতের এজলাস কক্ষে আসামিদের জন্য তৈরি করা লোহার খাঁচায় দাঁড়ানো নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। জীবনে প্রথমবার এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি তিনি। এ ঘটনা তার চোখে ‘অভিশপ্ত জীবনের অংশ’।  তিনি বলেন, আজ আমি অভিশপ্ত জীবনের শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছেছি। এই প্রথম আমাকে লোহার খাঁচায় দাঁড়াতে হলো’- আদালত থেকে বেরিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন ড. ইউনূস।

অর্থপাচার প্রতিরোধ আইনের মামলায় ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪ এর বিচারক সৈয়দ আরাফাত হোসেনের আদালতে রোববার (২ জুন) হাজিরা দিতে যান ড. ইউনূসসহ ১৪ আসামি। সেখানেই এ দৃশ্যের অবতারণা হয়।

পরে আদালত গ্রামীণ টেলিকমের শ্রমিক কর্মচারীদের সংরক্ষিত ফান্ডের লভ্যাংশের ২৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে করা মামলায় ড. ইউনূসসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আদেশের জন্য আগামী ১২ জুন দিন ধার্য করেন। ওইদিনই জানা যাবে এ মামলায় ড. ইউনূস বিচারের মুখোমুখি হবেন, নাকি মামলার দায় থেকে অব্যাহতি পাবেন।

এদিন, আলোচিত এ মামলায় অভিযোগ গঠনের শুনানিতে হাজিরা দিতে আদালতে প্রবেশ করে এজলাস কক্ষের বেঞ্চে বসেন ড. ইউনূস। শুনানির শুরুতে আদালত ড. ইউনূস ছাড়া বাকি আসামিদের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে বলেন। তখন ড. ইউনূস বলেন, তার জন্য অন্যদের এ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। তাই তিনি নিজেও স্বেচ্ছায় লোহার খাঁচায় তৈরি আসামির কাঠগড়ায় গিয়ে দাঁড়ান। মিনিট দুয়েক পর সবাই বিচারকের অনুমতি নিয়ে এজলাস কক্ষের বেঞ্চে গিয়ে বসেন। সবার শেষে বেঞ্চে বসেন ড. ইউনূস।

সব মিলিয়ে কাঠগড়ায় তিন মিনিটের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন ড. ইউনূস। পরে আদালত চত্বরে উপস্থিত সাংবাদিকদের তিনি বলেন, এই প্রথম লোহার খাঁচায় কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হলো। এটি একটি দেখার মতো দৃশ্য। এটি আমার জীবনের একটি স্মরণীয় ঘটনা যে, লোহার খাঁচার ভেতরে দাঁড়িয়ে আছি আদালতের কাঠগড়ায়। এ অভিশপ্ত জীবনের একটি অংশ।

শুনানির শুরুতে পেশকার ড. ইউনূসকে বলেন, আপনি বসেন। অন্য আসামিদের বলেন, আপনারা ডকে (কাঠগড়ায়) যান। এসময় নাজমুল ইসলামসহ অন্যরা কাঠগড়ায় গিয়ে দাঁড়ান। তখন ড. ইউনূসও তাদের সঙ্গে স্বেচ্ছায় লোহার খাঁচার কাঠগড়ায় প্রবেশের জন্য রওয়ানা দেন। পেশকার এবং ইউনূসের আইনজীবীরা তখন তাকে বলেন, আপনি বসেন। আপনাকে কাঠগড়ায় যেতে হবে না। বিচারক আপনাকে বসতে বলেছেন।

কিন্তু ড. ইউনূস তাদের কথায় কর্ণপাত না করে ঠিক ১০টা ৪২ মিনিটে অন্য আসামিদের সঙ্গে স্বেচ্ছায় কাঠগড়ায় প্রবেশ করেন। এসময় পেশকার ও তার আইনজীবীরা বারবার তাকে বলতে থাকেন, আপনাকে (ড. ইউনূস) বসতে বলেছেন আদালত। তখন কাঠগড়ায় থাকা সবাইকে তিনি বের হয়ে যেতে বলেন। তবে তার আইনজীবীরা বলেন, আদালত শুধু আপনাকে বসতে বলেছেন।

এসময় কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ড. ইউনূস বলেন, কাঠগড়ার বাইরে যদি যেতে হয় তবে সবাই যাবো। আমি একা গিয়ে বেঞ্চে বসবো না। বসলে সবাই মিলে বসবো। এর মিনিট তিনেক পর বেলা পৌনে ১১টার দিকে এজলাস থেকে বলা হয় সবাইকে কাঠগড়া থেকে বের হয়ে আসতে। তখন ড. ইউনূস সবাইকে নিয়ে কাঠগড়া থেকে বের হন। বের হয়ে তাদের বলেন, আপনারা এখানে বসেন। সবাই বসার পর ড. ইউনূস দ্বিতীয় বেঞ্চে গিয়ে বসেন। এরপর মামলার অভিযোগ গঠন শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।

এরপর দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করতে শুনানি করেন। শুনানিতে তিনি বলেন, ড. ইউনূস ২৬ কোটি টাকা কর্মচারীদের দিতে অনুমোদন দিয়েছেন, যা আইনগতভাবে তিনি দিতে পারেন না। এ মামলার সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড আর সর্বনিম্ন ১০ বছরের কারাদণ্ড। আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের উপাদান রয়েছে। ড. ইউনূসসহ সব আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হোক।

দুদকের পিপির শুনানি শেষে ড. ইউনূসের অব্যাহতি চেয়ে তার আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুল্লাহ আল মামুন শুনানি করেন। শুনানিতে তিনি বলেন, ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা শ্রম আইনে বিচার্য বিষয়। মামলার দায় থেকে তিনি অব্যাহতি পাওয়ার হকদার। এরপর অন্য আসামিদের পক্ষে অব্যাহতি চেয়ে শুনানি করেন তাদের আইনজীবীরা। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে দুপুর ২টার দিকে আদালত এ বিষয়ে আদেশের জন্য ১২ জুন দিন ধার্য করেন।

পরে আদালত থেকে বের হয়ে উপস্থিত সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ড. ইউনূস বলেন, এ পর্যন্ত যত অভিযোগ এসেছে আমার বিরুদ্ধে এবং আমার সহকর্মীদের বিরুদ্ধে, তার মধ্যে এটি আমার মনে কঠিনভাবে দাগ কেটেছে, কষ্ট লেগেছে। কারণ, আমার পরিবারকে আক্রমণ করেছে। কেন আমাদের এ অভিশাপ বহন করতে হচ্ছে, সেটি আমাদের আইনজীবী বলবেন।

 

২০২৩ সালের ৩০ মে গ্রামীণ টেলিকমের শ্রমিক-কর্মচারীদের কল্যাণ তহবিলের ২৫ কোটি ২২ লাখ ৬ হাজার ৭৮০ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। সংস্থাটির উপ-পরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান বাদী হয়ে এ মামলা করেন।

২০২৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা দুদকের উপ-পরিচালক গুলশান আনোয়ার। দুদকের মামলায় আসামি ছিলেন ১৩ জন। পরে চার্জশিটে নতুন করে একজন আসামির নাম যুক্ত হয়।

আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯/৪২০/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/১০৯ ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর ৪(২) ও ৪(৩) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। গত ২ এপ্রিল ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ আস-সামছ জগলুল হোসেনের আদালত এ চার্জশিট গ্রহণ করে বিচারকাজের জন্য মামলাটি ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪ এ বদলির আদেশ দেন।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, আসামিরা ২৫ কোটি ২২ লাখ ৬ হাজার ৭৮০ টাকা জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করেছেন। সদস্যদের উপস্থিতিতে ২০২২ সালের ৯ মে অনুষ্ঠিত ১০৮তম বোর্ডের সিদ্ধান্ত মোতাবেক ঢাকা ব্যাংকের গুলশান শাখায় হিসাব খোলা হয়। গ্রামীণ টেলিকমের কর্মচারীদের পাওনা লভ্যাংশ বিতরণের জন্য গ্রামীণ টেলিকম শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়ন এবং গ্রামীণ টেলিকমের সঙ্গে সেটেলমেন্ট অ্যাগ্রিমেন্ট চুক্তি হয় ওই বছরের ২৭ এপ্রিল।

গ্রামীণ টেলিকমের বোর্ড সভার হিসাব খোলার সিদ্ধান্ত ৯ মে হলেও হিসাব খোলা হয় একদিন আগে ৮ মে। সেটেলমেন্ট অ্যাগ্রিমেন্টেও ৮ মে ব্যাংক হিসাসে দেখানো আছে, যা বাস্তবে অসম্ভব। এরকম ভুয়া সেটেলমেন্ট অ্যাগ্রিমেন্টের শর্ত অনুযায়ী ও ১০৮তম বোর্ডের সিদ্ধান্ত মোতাবেক ২০২২ সালের ১০ মে গ্রামীণ টেলিকমের ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের মিরপুর শাখা থেকে ঢাকা ব্যাংকের গুলশান শাখায় ৪৩৭ কোটি ১ লাখ ১২ হাজার ৬২১ টাকা স্থানান্তর করা হয়।

পরবর্তীসময়ে ২২ জুন অনুষ্ঠিত গ্রামীণ টেলিকমের ১০৯তম বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অ্যাডভোকেট ফি হিসেবে অতিরিক্ত ১ কোটি ৬৩ লাখ ৯১ হাজার ৩৮৯ টাকা প্রদানের বিষয়টি অনুমোদন দেওয়া হয়। অন্যদিকে ঢাকা ব্যাংকের গুলশান শাখার হিসাব থেকে গ্রামীণ টেলিকম শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়ন নামীয় ডাচ-বাংলা ব্যাংকের লোকাল অফিসের হিসাবে তিন দফায় মোট ২৬ কোটি ২২ লাখ ৬ হাজার ৭৮০ টাকা স্থানান্তর করা হয়।

কিন্তু কর্মচারীদের লভ্যাংশ বিতরণের আগেই প্রাপ্য অর্থ তাদের না জানিয়ে অসৎ উদ্দেশে ২০২২ সালের মে ও জুন মাসের বিভিন্ন সময়ে সিবিএ নেতা মো. কামরুজ্জামানের ডাচ-বাংলা ব্যাংকের মিরপুর শাখার হিসাবে মোট ৩ কোটি টাকা, সিবিএ নেতা মাইনুল ইসলামের হিসাবে ৩ কোটি ও সিবিএ নেতা ফিরোজ মাহমুদ হাসানের ডাচ-বাংলা ব্যাংক মিরপুর শাখার হিসাবে ৩ কোটি টাকা স্থানান্তর করা হয়।

একই ভাবে অ্যাডভোকেট মো. ইউসুফ আলীর কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলনের ধানমন্ডি শাখার হিসাবে ৪ কোটি টাকা ও দ্য সিটি ব্যাংকের গুলশান শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শক গ্রামীণ টেলিকম কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ সংবলিত একটি প্রতিবেদন দুদকে পাঠানো হয়। ওই প্রতিবেদনের সূত্র ধরে ২০২২ সালের ২৮ জুলাই অনুসন্ধান শুরু হয়।

মামলার আসামিরা হলেন, গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ ইউনূস, ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নাজমুল ইসলাম, পরিচালক ও সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আশরাফুল হাসান, পরিচালক পারভীন মাহমুদ, নাজনীন সুলতানা, মো. শাহজাহান, নূরজাহান বেগম ও পরিচালক এস. এম হাজ্জাতুল ইসলাম লতিফী।

এছাড়া অ্যাডভোকেট মো. ইউসুফ আলী, অ্যাডভোকেট জাফরুল হাসান শরীফ, গ্রামীণ টেলিকম শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি মো. কামরুজ্জামান, সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ মাহমুদ হাসান ও প্রতিনিধি মো. মাইনুল ইসলাম ও দপ্তর সম্পাদক কামরুল ইসলামকে আসামি করা হয়েছে।

সম্পাদক ও প্রকাশক : শাহীন চাকলাদার  |  ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আমিনুর রহমান মামুন।
১৩৬, গোহাটা রোড, লোহাপট্টি, যশোর।
ফোন : বার্তা বিভাগ : ০১৭১১-১৮২০২১, ০২৪৭৭৭৬৬৪২৭, ০১৭১২-৬১১৭০৭, বিজ্ঞাপন : ০১৭১১-১৮৬৫৪৩
Email : samajerkatha@gmail.com
পুরাতন খবর
FriSatSunMonTueWedThu
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930 
স্বত্ব © samajerkatha :- ২০২০-২০২২
crossmenu linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram