ইউএস-বাংলা বিধ্বস্ত : কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা

# নিয়ন্ত্রণ কক্ষের ৬ কর্মকর্তা বদলি, হতাহত বাংলাদেশিদের তালিকা প্রকাশ

সমাজের কথা ডেস্ক॥ নেপালে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজ বিধ্বস্তের কারণ নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা রয়েছে। ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান নাকি পাইলটের সাথে ভুল বোঝাবুঝি তা নিয়েও রয়েছে অস্পষ্টতা। এরই মধ্যে কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষে সে সময় দায়িত্বে থাকা ছয় কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে।
ইউএস-বাংলার ফ্লাইট বিএস ২১১ কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিধ্বস্ত হওয়ার আগে ককপিটে বিভ্রান্তির আভাস মিলেছে নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সঙ্গে পাইলটের শেষ চার মিনিটের কথোপকথনে।
নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সঙ্গে পাইলটের কথোপকথনের একটি অডিও ইউটিউবে ছড়িয়ে পড়েছে। এ বিষয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য এসেছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স ও ত্রিভুবন বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে।
এদিকে, দেশটির ইংরেজি নিউজ পোর্টাল মাই রিপাবলিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনা প্রত্যক্ষ করার ধাক্কা ‘সামলে ওঠার সুযোগ দিতে’ বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এ ব্যবস্থা নিয়েছে।
ঢাকা থেকে ৬৭ জন যাত্রীসহ ৭১ জন আরোহী নিয়ে সোমবার দুপুরে ত্রিভুবনে নামার সময় ইউএস-বাংলার ফ্লাইট ফ্লাইট বিএস ২১১ রানওয়ে থেকে ছিটকে পড়ে এবং আগুন ধরে যায়।
ওই উড়োজাহাজে নেপালের ৩৩ জন, বাংলাদেশের ৩২ জন এবং চীন ও মালদ্বীপের একজন করে যাত্রী ছিলেন। তাদের মধ্যে ৪৯ জনের মৃত্যু হয়েছে, ২২ জনকে কাঠমান্ডুর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর খবর। মঙ্গলবার হতাহত বাংলাদেশিদের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে।
ড্যাশ-৮ কিউ৪০০ মডেলের ওই উড়োজাহাজটি কেন দুর্ঘটনায় পড়ল, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সঙ্গে পাইলটের শেষ মুহূর্তের কথোপকথনের একটি রেকর্ড প্রকাশ পেয়েছে, যাতে মনে হয় রানওয়েতে নামা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
ত্রিভুবন কর্তৃপক্ষ বলেছে, যে দিক দিয়ে বিমানটির রানওয়েতে নামার কথা ছিল, পাইলট নেমেছেন তার উল্টো দিক দিয়ে। অন্যদিকে ইউএস-বাংলা কর্তৃপক্ষ এ দুর্ঘটনার জন্য ত্রিভুবনের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ এনেছে।
তবে নেপালের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের উপ মহা পরিচালক রাজন পোখারেল বলেছেন, ওই অডিও রেকর্ডের সঙ্গে ছয় কর্মকর্তাকে বদলির কোনো সম্পর্ক নেই।
তার ভাষায়, দুর্ভাগ্যজনক এমন দুর্ঘটনার পর মানসিক চাপ লাঘবের এটাই প্রচলিত নিয়ম।
“তাদের সামনে বড় ধরনের একটি বিপর্যয় ঘটেছে। তাদের মনের ওপর এতে বড় ধরনের চাপ পড়েছে। এ কারণে আমরা তাদের অন্য বিভাগে বদলি করেছি।”

ইউএস বাংলার জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক কামরুল ইসলাম মঙ্গলবার ঢাকায় এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলেন, বিএস ২১১ এর দুর্ঘটনার পেছনে পাইলট আবিদ সুলতানের কোনো ভুল ছিল না।
“ইউএস-বাংলার ড্যাশ-৮ কিউ৪০০ মডেলের বিমানে তিনি ১৭০০ ঘণ্টা ফ্লাই করেছেন। বাংলাদেশের এভিয়েশনে ৫০০০ ঘণ্টার উপরে কাজ করেছেন। কাঠমান্ডু এয়ারফিল্ডে শতাধিক ল্যান্ডিং ওনার আছে। এয়ারফিল্ড, এয়ারক্রাফট ওনার জন্য নতুন কিছু না। আমাদের মনে হয় না, এখানে ক্যাপ্টেনের কোনো ভুলভ্রান্তি আছে।”
ত্রিভুবন বিমানবন্দরের জেনারেল ম্যানেজার রাজ কুমার ছেত্রীর বরাত দিয়ে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, তদন্তকারীরা সোমবারই ধ্বংসস্তূপ থেকে ফ্লাইটের ডেটা রেকর্ডার উদ্ধার করেছেন।
এ দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে ছয় সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করেছে নেপাল সরকার।
দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সাবেক মহাপরিচালক যজ্ঞ প্রসাদ গৌতমের নেতৃত্বে ওই কমিটি ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। তাদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
এদিকে, কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিধ্বস্ত ইউএস-বাংলার উড়োজাহাজে থাকা ৩৬ বাংলাদেশির মধ্যে চারজন ক্রু এবং ২২ যাত্রীর মৃত্যু হয়েছে; আহত অবস্থায় হাসপাতালে আছেন দশজন।
ভয়াবহ ওই বিমান দুর্ঘটনার পর মঙ্গলবার বিকালে কাঠমান্ডুর বাংলাদেশ দূতাবাস হতাহতদের তালিকা প্রকাশ করেছে।
সোমবার দুপুরে ত্রিভুবনে বিধ্বস্ত ইউএস-বাংলার ফ্লাইট বিএস২১১ এর ৭১ আরোহীর মধ্যে মোট ৪৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে ২২ জন হাসপাতালে আছেন বলে জানিয়েছেন দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি অসিত বরণ সরকার।
তিনি বলেন, “হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ১০ জনই গুরুতরভাবে আহত।”
ইউএস বাংলার সিইও ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মঙ্গলবার সকালে কাঠমান্ডুতে পৌঁছেছেন এবং সেখানে তারা তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনায় সহযোগিতা করছেন বলে জানান তিনি।
নেপালের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের ডিজি সঞ্জীব গৌতম নেপালের সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, উড়োজাহাজটি ত্রিভুবনে নামার কথা ছিল রানওয়ের দক্ষিণ দিক দিয়ে। কিন্ত সেটি নামার চেষ্টা করে উত্তর দিক দিয়ে। এই অস্বাভাবিক অবতরণের কারণ এখনও তারা জানেন না।


অন্যদিকে ইউএস-বাংলার সিইও ইমরান আশিফ ঢাকায় এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে অভিযোগ করেন, নিয়ন্ত্রণ কক্ষের ‘বিভ্রান্তিকর বার্তার’ কারণে ইউএস বাংলার বিমান দুর্ঘটনায় পড়েছে বলে তারা সন্দেহ করছেন।
“গাফিলতিটা আমাদের পাইলটের দিক থেকে না। এটা এটিসি টাওয়ারের দিক থেকে। আমরা এই মুহূর্তে নিশ্চিত করে এটা বলছি না। তবে আমরা সন্দেহ করছি।”
ইমরান বলেন, রানওয়ের কোন দিক দিয়ে পাইলট ল্যান্ড করবেন, তা নিয়ে পাইলটকে ‘বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বার্তা দেওয়া হয়’ মাত্র তিন মিনিটের মধ্যে। এ কারণে ‘কনফিউশন’ থেকে দুর্ঘটনা ঘটে থাকতে পারে।
নেপালি কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে বিএস ২১১ এর ব্ল্যাকবক্স উদ্ধার করেছে। দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে সেখানে তদন্ত কমিটি হলেও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তেমন কোনো উদ্যোগের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জেল হোসেন চৌধুরী মায়া সন্ধ্যায় ইউএস বাংলার কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, “নেপালের টাওয়ার নাকি বাংলাদেশের কারও কারণে দুর্ঘটনা ঘটল, তা তদন্ত করতে বিমান মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করব।”
আর বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান পরিবহন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এম নাঈম হাসান  বলেন, “যে দেশে দুর্ঘটনা ঘটে, সাধারণত সেদেশের সিভিল এভিয়েশনই দুর্ঘটনার কারণ খুঁজে বের করে। ইউএস বাংলার ক্ষেত্রে যেটা হয়েছে, এখানে আমাদের কোনো সহায়তার দরকার হলে আমরা করব।”
বিএস ২১১ এর ককপিটে শেষ মুহূর্তে কী ঘটেছিল- নিয়ন্ত্রণ কক্ষ ও পাইলটের কথোপকথন থেকে তা বোঝার চেষ্টা করেছেন নেপালের সাংবাদিক কনক মনি দিক্ষিত।

নেপাল টাইমসে এক প্রতিবেদনে তিনি লিখেছেন, ওই চার মিনিটের কথা শুনলে মনে হয়, কোন দিক দিয়ে রানওয়েতে নামতে হবে তা নিয়ে পাইলটের মধ্যে হয়ত বিভ্রান্তি কাজ করছিল।

ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে দক্ষিণ অংশের নাম রানওয়ে ০২; আর উত্তর অংশকে বলা হয় রানওয়ে ২০।

“বমবার্ডিয়ার উড়োজাহাজটি যখন এগিয়ে যাচ্ছিল, অন্য উড়োজাহাজের নেপালি পাইলটরা শুনতে পান, এটিসি থেকে ইউএস বাংলার পাইলটকে হুঁশিয়ার করা হচ্ছে যে, তাকে কিছুটা বিভ্রান্ত মনে হচ্ছে এবং তার উচিত রাডার অনুসরণ করা। ”

কনক মনি দিক্ষিত লিখেছেন, দুর্ঘটনার মিনিট চারেক আগে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে ওই অডিওতে বলতে শোনা যায়, সে যেন রানওয়ে ২০ এর দিকে না যায়। পরে তাকে বলা হয়, সে যেন অবতরণ না করে, কারণ আরেকটি উড়োজাহাজ নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

বিএস ২১১ ডান দিকে ঘুরতে শুরু করলে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ পাইলটের কাছে জানতে চায়, তিনি কোন দিক দিয়ে নামতে চান- রানওয়ে ০২, না রানওয়ে ২০।

পাইলট তখন বলেন, তিনি রানওয়ে ২০ ধরতে চান। তখন তাকে অনুমতি দেওয়া হয়।
নিয়ন্ত্রণ কক্ষ এরপর জানতে চায়, পাইলট রানওয়ে ঠিকমত দেখতে পাচ্ছেন কি না। তিনি ‘নেগেটিভ’ বললে তাকে ডান দিকে ঘোরার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে পাইলট বলেন- ‘অ্যাফারমেটিভ’, অর্থাৎ তিনি রানওয়ে দেখতে পাচ্ছেন।

কনক মনি দিক্ষিত লিখেছেন, ওই সময়ে পাইলট বলে ওঠেন তিনি রানওয়ে ০২ এ নামতে যাচ্ছেন, যদিও এর আগে তিনি উল্টো দিকে নামার অনুমতি চেয়ে আসছিলেন।

নিয়ন্ত্রণ কক্ষ এরপর তাকে রানওয়ে ০২ এ নামার অনুমতি দেয়। একই সময়ে দশ কিলোমিটার দূরে থাকা একটি সামরিক বিমানকে এটিসি থেকে জানানো হয়, বাংলাদেশি উড়োজাহাজটি রানওয়ে ২০ এ নামতে যাচ্ছে।

ওই রেকর্ডে ইউএস-বাংলার পাইলটের শেষ বাক্য ছিল- “আমরা কি নামার অনুমতি পেয়েছি?”

কিছু সময় নীরবতার পর নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে উদ্বিগ্ন চিৎকার শোনা যায়- ‘আমি আবার বলছি, ঘোরাও।

কনক মনি দিক্ষিত লিখেছেন, এরপর আরও কিছুক্ষণ নীরবতা পেরিয়ে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে অগ্নি সংকেত বাজতে শুরু করে। এর মানে হল, উড়োজাহাজটি দুর্ঘটনায় পড়েছে এবং বিমানবন্দরের অগ্নি নির্বাপণী সংকেত চালু হয়েছে।

এরপর একজন নেপালি পাইলট জানতে চান, রানওয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে কি না। নিয়ন্ত্রণ কক্ষ জানায়, রানওয়ে বন্ধ।

ইউএস-বাংলার সিইও ইমরান আশিফ সন্ধ্যায় কোম্পানির কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, “ওই কথপোকথন শুনলেই বুঝবেন-এটিসির পক্ষ থেকে একটা ভুল বার্তা দেওয়ার বা গাফিলতি হওয়ার একটা টেনডেনসি দেখা যাচ্ছে। আমরা এটা ইনভেস্টিগেশন করছি।”

তিনি বলেন, তারা অভিযোগ করছেন না, তবে এটা তাদের সন্দেহ যে এটিসির গাফিলতি ছিল।

“গাফিলতিটা আমাদের পাইলটের দিক থেকে না। এটা টাওয়ারের দিক থেকে। আমরা এই মুহূর্তে নিশ্চিত করে এটা বলছি না। তবে আমরা সন্দেহ করছি।”

ইউএস-বাংলার সিইও দাবি করেন, কানাডার বমবার্ডিয়ার কোম্পানির তৈরি ওই উড়োজাহাজের বয়স ১৬ বছর।

“বিমানে কোনা যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল না। আমাদের ৪টা এয়ার ক্রাফট রয়েছে। চারটাই ফ্লাই করে। ”

তিনি বলেন, ওই ফ্লাইটের পাইলট ছিলেন ক্যাপ্টেন আবিদ সুলতান, যিনি বিমান বাহিনীর একজন সাবেক পাইলট এবং তিনি ক্যারিয়ারে পাঁচ হাজারের বেশি ঘণ্টা উড়েছেন। যে উড়োজাহাজটি দুর্ঘটনায় পড়েছে, সেটি নিয়েই তিনি ১৭ শ’ ঘণ্টার বেশি ফ্লাই করেছেন।

ওই উড়োজাহাজের প্রধান বৈমানিক আবিদ সুলতান বেঁচে গেলেও আরেক বৈমানিক পৃথুলা রশিদ মারা গেছেন বলে কাঠমান্ডু মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে দেওয়া তথ্যে জানা গেছে।

SHARE