‘ফুটবলের মাধ্যমে যশোরকে বিশ্বের সামনে তুল ধরবো’

যশোরের গর্ব জাতীয় দলের ফুটবলার মান্নাফ রাব্বি। সদর উপজেলার চুড়ামনকাটির ছাতিয়ানতলা সরকারপাড়ায় আব্দুল মোনায়েম ও আকলিমার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা মোনায়েম ফুটবল কোচ। রক্তের টানেই যেনো রাব্বির মনে জেগেছিলো ফুটবল- নেশা। এই কৃতি ফুটবলারের সাথে শুক্রবার কথা বলেন সমাজের কথার ক্রীড়া প্রতিবেদক ইমরান হোসেন পিংকু। জানা যায় মান্নাফ রাব্বি হয়ে ওঠার গল্প। যে গল্প এখন ইতিহাস। আসুন জেনে নিই সেই গল্পের কিছুটা…
সমাজের কথা : মান্নাফ রাব্বি হয়ে ওঠার শৈশব-শুরুটা…
মান্নাফ: বাবাই আমার ফুটবলে প্রথম শিক্ষাগুরু। তিনি ফুটবল কোচ। হাতেখড়িটা তাই ভালোভাবেই দিয়েছিলেন। এলাকায় খেলছিলাম আর শিখছিলাম। বয়স তখন ১২। যশোর শামস্-উল-হুদা স্টেডিয়ামে ক্যানেডি ওয়ার্ফের অনূর্ধ্ব-১২ ট্রায়েল হয়। সেখানে আমি (মান্নান রাবিব), ছোট বাবুসহ ছয় জন সিলেক্ট হয়। পরে ঢাকায় ক্যাম্পে যায়। সেখানে আমরা ছয়জনই বাদ পড়ে যায়। বাড়িতে ফিরে মনের কষ্টে খেলা ছেড়ে দিই। পরে প্রতিবেশি দাদা মহিউদ্দিনের অনুপ্রেরণায় খেলা শুরু করি। তিনি এক সময় যশোরের ভালো ফুটবলার। তার কাছে শিখে নিই ফুটবলের আরও কিছু। আমি যখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি। তখন যশোর শামস্-উল-হুদা ফুটবল একাডেমি একটি ট্রায়েলের আয়োজন করে। সেখানে আমি অংশগ্রহণ করে চান্স পাই। তারপর শামস্-উল-হুদা ফুটবল একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নিতে থাকি। পরে এক সময় রাজধানীর নামকরা ‘ঢাকা রহমতগঞ্জ ক্লাব’এ খেলার সুযোগ পাই। আর সেখান থেকে নিজের অবস্থান তৈরি করতে থাকি।
সমাজের কথা : প্রথমে জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার অনুভুতি…
মান্নাফ রাব্বি : রহমতগঞ্জ ক্লাবের হয়ে ঢাকায় অবস্থান করছিলাম। তখন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) থেকে ক্লাবে আমার নামে একটি চিঠি আসে এবং ফোনেও একটি কল আসে। জানতে পারি, আমি বাংলাদেশ ফুটবলে অনূর্ধ্ব-১৯ দলে চান্স পেয়েছি। আনন্দে সে রাত ঘুমাতে পারিনি। ভালো খেলার জন্য অনূর্ধ্ব-২৩ এও চান্স পাই। পরে বাংলাদেশ জাতীয় দলে ডাক আসে।
সমাজের কথা : তখন আপনার বাবা-মা ও স্বজনদের অনুভূতি সম্বন্ধে বলুন…
মান্নাফ রাব্বি : বাবার স্বপ্ন ছিলো- ফুটবলার হিসাবে সারা বিশ্ব আমাকে চিনবে, নিজ জেলা যশোরকে আমি তুলে ধরবো সবার সামনে। মা তো মা-ই। মায়ের স্বপ্ন তো সন্তানের জন্য ভুবনজোড়া। স্বজনেরা ও প্রতিবেশিরা আমাকে খুবই আদর করতেন। সুতরাং বুঝতেই পারছেন।
(একটু হেসে…) সংবাদ পেয়ে বাবার চোখ ভিজে গিয়েছিলো বুঝেছিলাম। আনন্দের অশ্রু। আমারও ঝরেছিলো কিছু।
সমাজের কথা : সফলতার পর্দার পেছনের ব্যক্তিটি…
মান্নাফ রাব্বি : এক কথাই বাবা। তিনিই আমার ফুটবলের প্রথম অনুপ্রেরণা। এখনও দিয়ে যাচ্ছেন। ছোটবেলায় কাছে দাঁড়িয়ে বাবাকে প্রশিক্ষণ দিতে দেখতাম। আমার আগ্রহ দেখে বাবাই আমার দিকে প্রথম বল এগিয়ে দিয়েছিলেন। আমি আমার ছোট্ট পা দিয়ে বাবার দিকে বল কিক্ করেছিলাম। (হাসতে হাসতে বলেন) পায়ে কিছুটা ব্যথাও পেয়েছিলাম। তখন তো অনেক ছোট। কীভাবে বল কিক্ করতে হয় জানতাম না। বাবা শিখিয়ে দিতে শুরু করলেন। আর একজন বাবার মতোই আমার পাশে ছিলেন, এখনও আছেন। তিনি আমার শিক্ষক। তিনি শামস্-উল-হুদা ফুটবল একাডেমির কোচ মারুফ হোসেন স্যার। যশোরবাসী তো সব সময়ই দোয়া, তাদের ভালোবাসা আমাকে এগিয়ে যেতে সহযোগিতা করেছে।
সমাজের কথা : জাতীয় দলে গ্রিনরুমের প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা…
মান্নাফ রাব্বি : প্রথম দিন ভয়ে ভয়ে গ্রিনরুমে প্রবেশ করি। কোথায় বসবো, কার সাথে কথা বলবো, সিনিয়র ভাইরা কী বলবে- এই নিয়ে ভয়ে ছিলাম। আস্তে আস্তে জড়তা দূর হয়ে গেছে। এখনও সেদিনের কথা খুব বেশি মনে পড়ে।
সমাজের কথা : ভবিষ্যত লক্ষ্য…
মান্নাফ রাব্বি : বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘ দিন নিজেকে রিপ্রেজেন্ট করা।
সমাজের কথা ডেস্ক : যশোরে থেকে জাতীয় মানের ফুটবলার তৈরি করার জন্য কোনো পরিকল্পনা আছে কি?
মান্নাফ রাব্বি : যশোর তার ফুটবলে হারানো গৌরবকে ফিরিয়ে দেওয়ার লক্ষে ইতিমধ্যে চুড়মনকাটিতে আব্দুর রাজ্জাক ফুটবল একাডেমি প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। সেখানে বিনামূল্যে নতুন ফুটবলারদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। এদের মধ্যে যারা ভালো খেলবে তাদেরকে ঢাকার বড় ক্লাবগুলোতে খেলার সুযোগ করে দেয়ার ইচ্ছা আছে। এ বিষয়ে আমাকে সার্বক্ষণিক আন্তরিক সহযোগিতা করছেন আমাদের এলাকার ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান মুন্না ভাই।
সমাজের কথা : গতবছরে সংবাদ সম্মেলন করে যশোরে ফুটবল থেকে অবসর নিয়েছেন। জেলা দলে পরবর্তীতে ফিরে আসার ইচ্ছা আছে কি ?
মান্নাফ রাব্বি : যশোরে আবারও ফুটবল খেলার মত পরিবেশ তৈরি হলে ভেবে দেখবো। এ বিষয়ে অনেক ভাবনার আছে। অনেক মনকষ্ট জমে আছে। অশ্রুজমাট আঁধার নিয়ে ভেবে নবীনদের নিরুৎসাহিত করতে চাই না। আমার চিন্তা এখন শুধুই এগিয়ে যাওয়ার, যশোরকে এগিয়ে নেয়ার। জেলা দলে খেলা বা না খেলা সেখানে বাঁধা হবে না বলেই আমার বিশ্বাস। কারণ যশোরবাসী সব জানেন, বোঝেন।
সমাজের কথা : খেলার পরিবেশ তৈরির জন্য যশোর জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের করণীয়…
মান্নাফ রাব্বি : (ঠোঁটে স্মিত হাসি রেখে…) এ বিষয়টা ফুটবলার আমোদীদের কাছে স্বচ্ছ কাঁচের মতো। নতুন করে কিছু বলার থাকে না। তবুও জানতে চেয়েছেন তাই বলা। খেলার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে ডিএফএ’কে সততার সাথে এগোতে হবে। চেয়ারের মোহ ছাড়তে হবে। চেয়ারের দ্বন্দ্ব যতোদিন থাকবে, ততোদিন পর্যন্ত খেলোয়াড় তৈরির কাজ এগোবে না। হয়তো লিগ হবে। কিন্তু শুধু লিগ দিয়ে ভালো মানের খেলোয়াড় তৈরি হয় না। তাই সব ভেদাভেদ ভুলে সিনিয়র-জুনিয়রদের এক সাথে নিয়ে কাজ করতে হবে। তাতে ‘ডিএফএ’র সুনাম বাড়বে। এতে জাতীয় দলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মত খেলোয়াড়ও তৈরি হবে এবং ফুটবলে যশোর তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে।

SHARE