সাতক্ষীরা পুলিশলাইন্স স্কুল শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্যে অতিষ্ঠ অভিভাবক মহল!

সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা ॥ সাতক্ষীরা পুলিশ লাইন বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেপরোয়া কোচিং বাণিজ্য থেকে মুক্তি পেতে পুলিশ সুপারের কাছে অভিযোগ করেছেন অভিভাবকরা। অভিযোগটি পুলিশের অভিযোগ বক্সে প্রদান ছাড়াও পুলিশ সুপারের নিকট প্রেরণ করা হয়েছে। তবে সর্বশেষ খবরে এখনও পর্যন্ত কোন প্রতিকার দেখা যায়নি বলে জানিয়েছেন তারা।
প্রাপ্ত তথ্যে জানাগেছে, পুলিশ লাইন স্কুল মাধ্যমিক বিদ্যালয় জেলার ঐতিহ্যবাহি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সম্প্রতি এই প্রতিষ্ঠানে স্কুল চলাকালিন সময়ে ক্লাস না নিয়ে কোচিং এবং নিজ নিজ বাসা বাড়িতে কোচিং বাণিজ্যে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন স্কুলের একাধিক শিক্ষক। এতে স্কুলের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবক মহল। অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, কোচিং বাণিজ্য ও বিভিন্ন ইস্যু দেখিয়ে টাকা আদায় প্রতিষ্ঠানটিতে নিয়মে পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি সরকারের কোচিং বাণিজ্য বন্ধের নির্দেশকে উপেক্ষা করে পুলিশ লাইন্স স্কুলে কোচিং ব্যবসা বেশ জমজমাট আকার ধারণ করেছে। একাধিকবার অভিভাবকরা উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানালেও কোন প্রতিকার পায়নি। ওই স্কুলের শিক্ষক মোমেনা খাতুন ও ক্রীড়া শিক্ষক ইমরান হোসেন, আরজু ম্যাডাম, মোবিনা ম্যাডাম, জাকির হোসেন, রাবেয়াসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের বাধ্যতা মুলক কোচিং করানোর অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষক ইমরানের কাছে ও মোমেনার কাছে কোচিং না করলে এ সমস্ত কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ক্লাসে নানাভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ মারপিট করার অভিযোগ করেছেন ভূক্তভোগি শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা।
সুত্র আরও জানায়, ক্লাস ওয়ান থেকে ৪ শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের কোচিং করানোর কোন দরকার নেই। তবুও স্কুলের শিক্ষকরা শিক্ষার্থী প্রতি স্কুলে ৮শ টাকা করে নেয়ার ঘটনায় রিতিমত অসন্তোস অব্যহত আছে। গত বছর ছিলো ৫শ টাকা, এবছর বাড়িয়ে ৮শ টাকা করা হয়েছে। তবে অভিভাবকরা জানিয়েছেন, প্রধান শিক্ষিকা আমিনা হক গেল বছরের কোচিং ফি চলমান বছরে নেয়ার নির্দেশ দিলেও ক্লাস শিক্ষকরা তা না মেনে ৮’শ টাকা দাবি করায় বেশ অসন্তোষ চলছে স্কুল অভ্যন্তরেই। এ সমস্ত শিক্ষকরা সরকারের নির্দেশ অমান্য করে কোচিং করছেন, আবার প্রধান শিক্ষিকার নির্দেশ অমান্য করে বেশি টাকা দাবি করছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক অভিভাবক বলেন, পুলিশের নিয়ন্ত্রণে স্কুলটি পরিচালিত হওয়ায় আশেপাশের অন্যান্য স্কুলের তুলনায় অনেক সুনাম রয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি কিছু শিক্ষক রীতি মতো আমাদের জিম্মি করে ফেলেছে। স্কুল চলাকালিন সময়ে সঠিকভাবে ক্লাস না নিয়ে রেজাল্ট ভালো করার নিশ্চয়তা দিয়ে কোচিং ব্যবসায় তারা ব্যস্ত সময় পার করছেন। স্কুলটি পুলিশ প্রশাসন দ্বারা পরিচালিত হওয়ায় অভিভাকরা এর প্রতিবাদ করতে সাহস পান না। শিক্ষকরা রীতি মতো কোচিং করার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন বলে অভিযোগ করেন তারা। শহরের বিভিন্ন স্থানে নব নির্মিত পুলিশের অভিযোগ বাক্সে ফেলা হয়েছে অভিযোগ পত্রের একটি কপি।
একজন অভিভাবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাসায় যেয়ে কোচিং করানোর কারণে শিশুর শারীরিক বিকাশের অন্যতম মাধ্যম খেলাধুলা করার সময় পর্যন্ত পাচ্ছে না। এতে করে আমাদের শিশুদের ভবিষ্যত কোন দিকে যাবে সেটি নিয়ে খুব চিন্তিত। যা পড়ানোর কথা স্কুলে, তা পড়নো হচ্ছে কোর্চি সেন্টারে। স্কুলে কোচিং করাচ্ছেন এবং ভালো ফলাফলের নিশ্চয়তা দিয়ে বাড়ি যেয়ে স্পেশালভাবে পড়ানোর নাম করে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা নেয়ারও অভিযোগ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ওই স্কুলের শিক্ষক মোমেনা খাতুন ও ক্রীড়া শিক্ষক ইমরান হোসেন, আরজু, মোবিনা, জাকির হোসেন, রাবেয়াসহ বেশ কয়েকজন কোচিং বাণিজ্যের টপ লিস্টে। তাদের কাছে কোচিং না করলে শিক্ষার্থীদের চাপ প্রয়োগ করা হয়। বিষয়টি পুর্বের পুলিশের উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হলেও তা নিরসন হয়নি। ১ম শ্রেণী থেকে ৪র্থ শ্রেণির কোচিং বাণিজ্য বাসায় এবং স্কুলে বন্ধ করার দাবিতে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। এখানে শুরু কোচিং বাণিজ্য নয়, অভিভাবকদের নি¤œমানের উচ্চ মুল্যের গাইড নেয়ার জন্যও চাপ দিচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্কুলের কয়েক শিক্ষার্থী জানায়, ভালো রেজাল্ট করার জন্য শিক্ষকরা গাইড বই কিনতে বলে এবং তাদের কাছে প্রাইভেট পড়তে বলে। না পড়লে ক্লাসে অপমান করা, বার্ষিক ফলাফলে নাম্বার কম দেয়াসহ নানা কৌশলে শিক্ষকরা তাদের সমস্যায় ফেলেন।
এ বিষয়ে জানতে চেয়ে শিক্ষক জাকির হোসেনের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে কল করে বন্ধ পাওয়া গেছে। স্কুলের শিক্ষক মোবিনা আক্তার বলেন, নতুন বছরের ক্লাস কেবল শুরু হয়েছে। তৃতীয় শ্রেণীর ২০ জন শিক্ষার্থী আমার কাছে পড়ে। আমার বাসায় কেউ পড়ে না আর আমি কোন শিক্ষার্থীর বাসায় যেয়েও পড়াই না। প্রধান শিক্ষক আমাদের বলে দিয়েছেন ৬’শ টাকা নেয়ার জন্য। আমি তার বেশি এক টাকা নিই না।
স্কুলের ক্রীড়া শিক্ষক ইমরান হোসেন বাধ্যতামুলক কোচিং করার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমি ৫ম শ্রেণীর কয়েকজন শিক্ষার্থীকে নিয়ে কোচিং করিয়ে থাকি। তবে যারা নিজেরা পড়তে চায়, তাদের পড়ানো হয়।
এ বিষয়ে পুলিশ লাইন স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা আমিনা হক বলেন, শিক্ষকদের সব সময় বলি কোচিং না করানোর জন্য। আমি সবসময় কোচিং বাণিজ্যের বিপক্ষে। তারপরও কোচিং করানোর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশনা রয়েছে। সেই অনুযায়ী শিক্ষকরা কোচিং করাচ্ছেন। সরকার নির্ধারিত কোচিং ফির ৫’শ টাকার বেশি নিচ্ছে সেই বিষয়ে আমার জানা নেই। শিক্ষার্থীদের গাইড বই ক্রয় করার বিষয়টি আমাকে কেউ বলিনি।