মণিরামপুরে জামায়াত-বিএনপি’র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত আ’লীগ কর্মী-সমর্থকের খবর কেউ রাখে না

মোতাহার হোসেন, মণিরামপুর॥ ২০১৩ সালে নাশকতার সময় জামায়াত-বিএনপি’র ক্যাডারদের হামলার শিকার মণিরামপুর উপজেলার অর্ধশতাধিক আ’লীগ কর্মী-সমর্থক চিকিৎসা খরচ জোগাতে গিয়ে সর্বশান্ত হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। তাদের খোঁজ রাখেন না স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ দলের নেতারা এমন অভিযোগ হামলার শিকার অনেকের। এখনো এদের অনেকেই ক্রেচে ভর দিয়ে হাটাচলা করেন। বর্তমানে চিকিৎসা খরচ তো দূরের কথা, সন্তান-সন্ততিদের মূখে দু’বেলা-দু’মুঠো অন্ন জোগাতে হিমশিম খাচ্ছেন এসব কর্মী সমর্থক। এদের অনেকেই ক্ষোভ করে বলেন, হামলাকারিদের অনেকেই এখন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ আ’লীগ নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় থেকে বুক ফুলিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ক্ষোভে-অভিমানে অনেকেই দলীয় সকল কার্যক্রম থেকে নিজেদের গুটিয়ে ফেলেছেন।
জানাযায়, মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে ফাঁসির আদেশ দেয়ার পর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় জামায়াত ও অতি উৎসাহী বিএনপি’র একটি অংশ ব্যাপক তান্ডব চালায়। এরই জের ধরে উপজেলার জামায়াত ও বিএনপি নেতাদের নামে একাধিক নাশকতার মামলা হয়। যশোরের তৎকালিন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও মণিরামপুর থানার তৎকালিন ওসি আলী আজমের নেতৃত্বে ১শ’ ২০ সদস্যের একদল পুলিশ ২০১৩ সালের ২২ মার্চ ফজরের নামাজের সময় একাধিক মামলার এজাহার নামীয় আসামি উপজেলা জামায়াতের আমির ফজলুর রহমানকে আটকের জন্য জয়পুরে গ্রামে অভিযান চালায়। এসময় তাকে না পেয়ে আক্কাজ আলী নামে আরেক আসামিকে আটক করে। এ সময় মাইকে ঘোষণা দিয়ে জামায়াত-বিএনপি’র কর্মী সমর্থকরা আসামি ছিনিয়ে নিতে পুলিশের উপর হামলা চালায়। পুলিশ আত্মরক্ষার্থে গুলি ছুঁড়লে আনিছুর রহমান নামে এক গ্রামবাসি নিহত এবং ১৮ জন আহত হন। এতে আরো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে তারা। এক পর্যায় পুলিশ ফাঁকা গুলি করে দ্রুত ওই গ্রাম থেকে থানায় চলে আসে। এরপর জামায়াত ও অতি উৎসাহী বিএনপি’র একটি অংশ জয়পুর গ্রামে ১শ’১২ আ’লীগ কর্মী সমর্থকের বাড়ি-ঘরে অগ্নিসংযোগ, ভাংচুর ও লুটপাট চালায়। প্রাণ রক্ষার্থে আ’লীগ কর্মী-সমর্থকরা গ্রাম ছেড়ে অন্যত্রে আশ্রয় নেয়। কিন্তু আ’লীগ সমর্থকদের মধ্যে যারা গ্রামে থেকে যান তাদের উপর চলতে থাকে নির্মম হামলা। ওই সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক অধিশাখা হতে বিষয়টি তদন্তের জন্য একই সালের ২৫ মার্চ জেলা প্রশাসককে নির্দেশনা দেয়া হয়। নির্দেশনা পেয়ে তৎকালিন ইউএনও শরীফ নজরুল ইসলাম ও প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসার ইয়ারুল হক সরেজমিন তদন্ত করে গোটা উপজেলায় ১শ’৩১ টি বসত বাড়ির ক্ষয়ক্ষতি নিরুপণ করে ২০১৩ সালের ২৭ ও ২৮ মার্চ পৃথক দুইটি প্রতিবেদন উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল করেন। যেখানে আর্থিক ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ কোটি ৮৩ লাখ ১৫ হাজার টাকা বলে প্রশাসনিক ওই সূত্রে জানাযায়।
ওই সময় জয়পুর, সমসকাটি, চান্দুয়া, শ্রীপুর, চালকীডাঙ্গা, পাড়দিয়াসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় আ’লীগ নেতা ও কর্মী-সমর্থকদের উপর হামলা চালিয়ে পঙ্গ করে দেয়।
সূত্র মতে, ২০১৩ সালের ২৮ মার্চ ইউনুস আলী, ১০ নভেবম্বর কোমর আলী, আব্দুল মান্নান, টিটো, খলিলুর রহমান, ১৩ মার্চ উপজেলা আ’লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক, ৯ আগস্ট ইউপি সদস্য ইউনিুস আলীসহ অর্ধ শতাধিক নেতা-কর্মীর উপর নির্মম হামলা করা হয়। এখনো তাদের অনেকেই সেই হামলার ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন। এখনো অনেকে ক্রেচে ভর দিয়ে হাটাচলা করেন।
সরেজমিন জয়পুর গ্রামে গেলে হামলার শিকার কয়েকজনের সাথে কথা হয়। এসময় জয়পুর গ্রামের কোমর আলী বলেন, চিকিৎসা নিতে চরম অর্থ সংকটে পড়ে পৈত্রিক জমি বিক্রি করতে হয়েছে। দুই পা এখনো একখানে করতে পারেন না। যে কারনে নিজে কোন কাজ করতে না পারায় বাধ্য হয়ে ৫ বছরের ছেলে সোহরাব ও ১ বছরের ছেলে নিরবকে বাড়িতে রেখে স্ত্রী আয়শা মাঠে কাজ করতে যান।
এখন কেউ তাদের খোঁজ রাখেন না জানিয়ে হামলার শিকার অনেকেই ক্ষোভের সাথে জানান, হামলাকারিদের আকবর আলী, শহিদুল ইসলাম, আসাদ, সিরাজ, জাকির, দেলোয়ার হোসেনসহ অনেকেই বর্তমানে ইউপি চেয়ারম্যান দূর্গাপদ সিংহ, ইউপি সদস্য আব্দুর রাজ্জাক, মোন্তাজ হোসেনসহ স্থানীয় নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় থাকে। অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আ’লীগের দলীয় ইউপি চেয়ারম্যান দূর্গাপদ সিংহ। তিনি বলেন, তাদের অনেকেই দলে যোগদান করতে চাই, তারপরও তাদের প্রশ্রয় দেয়ার প্রশ্নই ওঠে না। ইউপি সদস্য আব্দুর রাজ্জাক, স্থানীয় ওয়ার্ড আ’লীগের সভাপতি মোন্তাজ হোসেন বলেন, ‘তারা অমানবিক কাজ করেছে কিন্তু আমরা তো পারি না’।
হামলার শিকার আব্দুল মান্নান ও কোরবানসহ অনেকেই বলেন, চিকিৎসার সময় তৎকালিন এমপি প্রয়াত খান টিপু সুলতান কিছু টাকা পয়সা দিয়েছিলেন। এরপর বাড়ির গরু, ছাগল এমনকি পৈত্রিক জমি বিক্রি করে চিকিৎসার পিছনে ব্যয় করে সর্বশান্ত হয়ে গেছেন। এখন আর কেউ খোঁজই নেন না তাদের। শুধু তাই নয়, টাকা না হলে সরকারি অনুদানও মেলে না।
জয়পুর গ্রামের ইউনুস আলী বলেন, এখনো প্রতিদিন প্রায় ৫০ টাকার ওষুধ কিনতে হয়। তাই বাধ্য হয়ে পরের দোকানে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে হচ্ছে।
জানতে চাইলে উপজেলা আ’লীগের সভাপতি পৌর মেয়র কাজী মাহমুদুল হাসান বলেন, কারো বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।