গল্পের মোড়কে শিশুদেরকে সমাজ সচেতন করবে ‘গিট্টু দা’: সৈয়দ আহসান কবীর

শিশুসাহিত্যিক মিলন রহমান’র কিশোরগল্পের বই ‘গিট্টু দা’ প্রকাশ করেছে ‘ইরাবতী’। পাওয়া যাচ্ছে
বাংলা একাডেমি আয়োজিত অমর একুশে গ্রন্থমেলার ৪২৫ নম্বর স্টলে। বইটির পরিবেশনায় রয়েছে ‘চমনপ্রকাশ’ ও ‘রকমারি ডট কম’। আলমগীর জুয়েলের করা মনকাড়া প্রচ্ছদের এই বইটির মূল্য ২৫০টাকা। আসুন, কবি ও কথাসাহিত্যিক সৈয়দ আহসান কবীর’র লেখায় বইটি সম্বন্ধে জানতে চেষ্টা করি…

‘রকিব ফটোস্ট্যাট’-এ অভিযান চালিয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের জালচক্রকে হাতে নাতে ধরে পুলিশ। মূল হোতা রকিবকে আটক করেছে তারা। শিশু-কিশোরদের একটি সামাজিক ক্লাব সহযোগিতা করায় এই চক্রকে ধরতে সক্ষম হয়েছে বলে জানা যায়। চক্রকে ধরিয়ে দিতে ওই ক্লাবের সভাপতি ‘গিট্টু দা’ ইশতিয়াক নামে একটি ছেলেকে ঘুঁটি হিসাবে পাঠায় ফটোকপির দোকানে। তারই কাছে প্রশ্ন বেচতে গিয়ে সন্ধ্যা ছ’টায় পুলিশের হাত ধরা পড়ে রকিব।
জানা গেছে, গিট্টু দা’ কিশোর ক্লাবের সদস্য তুষার, আকাশ, আল আমিন, শান্তি, অমিত নানা সামাজিক সমস্যা ও তার সমাধান নিয়ে ভাবে। তাদের নেতা ‘গিট্টু দা’। রহস্যময় এই গিট্টু দা’ যা ভাবেন তা করেই ছাড়েন। কখনো কখনো হাসির খোড়াক যোগান। শিশু-কিশোরদের নিয়ে সৃজনশীল চিন্তার কারণে এলাকার ছেলে-বুড়ো সবাই তাকে ভালোবাসে।
এই তো সেদিন ‘ঈদ আনন্দে গিট্টুক্লাব’-এ বাংলাদেশের ক্রিকেটার মাশরাফি। সেকি হৈ চৈ। এই হৈ চৈ কান্ড বাধাতেই গিট্টু দা’র প্ল্যানে মাশরাফিকে আনা হয়। ঈদের আনন্দে গরিব ছেলে মেয়েদেরকেও সামিল করতে ক্লাবের একটি মিটিংয়ে প্ল্যান সাজায় গিট্টু দা। ব্যক্তিগতভাবে কতোই বা টাকা হবে। গিট্টু দা’ আয়োজন করলো ক্রিকেট ম্যাচের। সেখানে গ্রামের ছেলের দলের সাথে খেলবে ক্যাপ্টেন একাদশ। বিষয়টা আসলেই অন্য রকম। দর্শকদের ভিড় লেগে যায়। সেখান থেকেই মাশরাফির ঘোষণায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে ওঠে অনেক টাকা; সুবিশাল হৃদয়ের মাশরাফিও অনুদান দেন। এই টাকায় নতুন পোশাকে রঙিন হয়ে ওঠে হতদরিদ্র শিশুদের ঈদ আনন্দ।
এমনই আটটি গল্প নিয়ে শিশুসাহিত্যিক মিলন রহমানের লেখায় কিশোর উপযোগী গল্পগ্রন্থ ‘গিট্টু দা’ প্রকাশিত হয়েছে অমর একুশে গ্রন্থমেলায়। শিশুদের পাঠ উপযোগী শব্দ-বাক্য-গাঁথুনিতে হেঁটেছে কাহিনী। সহজ শব্দ, ছোট ছোট বাক্য কোমলমতি শিশুদের সহজেই টেনে নেবে গল্পের ভিতরে। কাহিনীগুলো খুবই সাবলীল, খুবই সৃজনশীল। প্রতিটি গল্পেই এই গল্পকার শিশুদেরকে সমাজ গড়ায় উদ্বুদ্ধ করেছেন। এক সাথে কাজ করতে গেলে নেতৃত্ব মানা, নেতার অনুপস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রক্রিয়াও শিখিয়েছেন তারুণ মুন্সিয়ানায়। শিশুসাহিত্যিক মিলন রহমানের এই বইতে ‘গিট্টু দা ছুটিতে’ পড়লেই তার লেখনির ধার বোঝা যাবে। ‘ব্লাড ডোনেশন ক্যাম্প’, ‘ গিট্টু ক্লাবের পাঠাগার’-এ কী অসাধারণ পরিকল্পনা।
মিলন রহমান ‘ফার্স্ট এইড বক্স’ গল্পে চলছিলো ‘বর্ষাকাল। দু’দিন ধরে টানা বৃষ্টিতে পথ, ঘাট, মাঠ পানিতে একাকার। ঘর থেকে বের হওয়ার উপায় নেই। মুষলধারে, আবার কখনও গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। কিছু সময়ের জন্য থামলেও গম্ভীর আকাশের মুখে হাসি নেই। সূর্যের দেখা নেই বলেই বুঝি মন ভার তার।’ গল্পের শুরুটা পড়লেই তার লেখা গল্পের সাবলীল ঢঙ অনুধাবন করা যায়। এই গল্পে ‘হেডস্যার আকাশের প্রশংসা আর রতনকে তিরস্কার করায়’ রাগ করে রতন। প্রতিশোধের নেশায় থাকে সে। আকাশের তৈরি ‘ফার্স্ট এইড বক্স’ ফেলে দেয়। সেদিনই মাঠে ফুটবল খেতে গিয়ে ‘পিছলে পড়লো রতন। তাড়াতাড়ি সবাই রতনকে ধরে তুললো। পা বেশ খানিকটা চিড়ে গেছে। আকাশ ছুটলো তার ফার্স্ট এইড বক্স আনতে। কিন্তু একি, ব্যাগে তো বক্সটা নেই! কী হলো! স্কুলে আসার সময় সে নিজ হাতে বক্সটা ব্যাগে ভরেছে। তুষার রতনের পা চেপে ধরে আছে। তবু রক্ত পড়া বন্ধ হচ্ছে না। বক্স না পাওয়ার কথা জানাতেই রতন চমকে উঠলো। রক্ত বন্ধ হচ্ছে না। কী করা যায়- ভাবছে সবাই। যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাওয়া রতন জানালো, বাথরুমের পেছনে জঙ্গলের ভেতরে রয়েছে বক্সটা। শান্তি ছুটলো ওটা আনতে। বক্সটা আনার পর স্যাভলন দিয়ে আকাশ কাটা জায়গা পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিলো।
একটু ঠা-া হতেই সবাই রতনকে চেপে ধরলো, ‘বক্সটা জঙ্গলের মধ্যে গেলো কী করে?’ চাপাচাপিতে কেঁদে ফেলে রতন। জানালো, সেদিন ওই বক্স নিয়ে হেডস্যার আকাশের প্রশংসা আর ওকে তিরস্কার করায় তার রাগ হয়। তাই বক্সটা ফেলে দিয়েছে।
এরপর সে আকাশের হাত চেপে ধরে বললো, ‘দোস্ত, তুই আমাকে মাফ করে দে। যে বক্স আমি ফেলে দিয়েছিলাম, সেটাই আজ আমার কাজে লাগলো!’ এভাবে লেখক তার গল্পের মাধ্যমে শত্রুভাবাপন্নকে বন্ধুতে পরিণত করেছেন। যা শিশু-কিশোর পাঠকদের জন্য শিক্ষামূলক বটে।
গাছকে শুধু লাগালেই হবে না, তার পরিচর্যা করে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। তাই ‘গাছ লাগাও, গাছ বাঁচাও’ স্লোগান সেঁটে দিলেন। এই গল্প পড়ে গাছ বাঁচানোর পরিকল্পনাও পাবে শিশু-কিশোর পাঠকরা।
আলমগীর জুয়েলের আঁকা আকর্ষণীয় মোড়কে শিশু সাহিত্যিক মিলন রহমানের ‘গিট্টু দা’ বইতে আটটি গল্প রয়েছে, প্রকাশ করেছে ‘ইরাবতী’। গল্পের মাঝে মাঝে ঘটনা-সংশ্লিষ্ট ছবি শিশুদের আকর্ষণ করবে গল্প পড়তে। গল্পগুলো পড়ে শিশুরা সমাজ সচেতন হবে বলে আমার বিশ্বাস। বইটি বাংলা একাডেমি আয়োজিত অমর একুশে গ্রন্থমেলার ৪২৫ নম্বর স্টলে পাওয়া যাচ্ছে। প্রকাশক, কবি ও উপন্যাসিক এনাম রেজা বইটির ভূয়সী প্রশংসা করে বলেছেন, ‘২৫০ টাকা মূল্যের এই বইটি শিশু-কিশোররা বেশ আনন্দের সাথেই কিনছেন।’

লেখক : কবি, কথাসাহিত্যিক।

SHARE