বিশুদ্ধ পানির সঙ্কট

পানি পান তো নয়, যেন বিষপান। বিশুদ্ধ জেনে ক্রয় করা বোতলের পানির মধ্যেই যে প্রাণঘাতী জীবাণু উদ্যমে-উল্লাসে নৃত্য করে তা টের পাওয়া কার সাধ্য! অথচ চোখ খোলা রাখলে এবং বোতলের পুনঃব্যবহার স্পষ্ট হলে বুঝতে হবে এ পানি পানি নয়, এ যে রোগের ডিপো, পানি পান করার পর ফেলে দেয়া বোতলটাই শোধনহীন পানিতে সয়লাব, এমনটা কেউ খেয়ালও করে না। দেদার বিক্রি হচ্ছে এসব বোতল ভরা পানি বাসটার্মিনাল, লঞ্চঘাট, রেলস্টেশনে। এককালে কম দামে পণ্য কেনা হলে বলা হতো, পানির দামে কেনা। কিন্তু একালে তা বলা বাস্তবসম্মত নয়। বোতলের পানির দামই বলে দেয় নদীমাতৃক দেশের মানুষকে চড়ামূল্যে পানি কিনে পান করতে হয়। তাও আবার অনেক ক্ষেত্রে তা স্বাস্থ্যকর নয়। বরং পানিবাহিত রোগের বিস্তার ঘটাতে সহায়ক। সাধারণত একজন মানুষের গড়ে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই লিটার বিশুদ্ধ পানি পান করা দরকার। আর সেই জন্য বোতলের পানিতে ব্যয় দাঁড়ায় ষাট টাকা। বাজারে আছে নানা রকমের পানির বোতল, হাফ লিটার থেকে এক-দুই-পাঁচ লিটার পর্যন্ত। একেকটার দাম একেক রকম। ‘মিনারেল ওয়াটার’ বোতলের গায়ে লেখা থাকলেও সব পানি যে তা নয়, এটা পান করলেই বোঝা যায়। আসল বোতলের পানির সঙ্গে নকল পানির বোতল বিক্রির হার কম নয়।
মান নিয়ন্ত্রণের জন্য যে কর্তৃপক্ষ আছেন, তাদের হয়ত সাধ্যে কুলায় না পানির বিশুদ্ধতা পরীক্ষার পর তা বাজারজাতকরণে অনুমোদন দান। বোতলের পানির বাইরেও বিক্রি হচ্ছে দেদার ফিল্টারের পানি। বোতল পানির তুলনায় ‘ফিল্টার’ পানির দাম অনেক কম। এর নিশ্চয় কার্যকারণ সূত্র রয়েছে। এসব পানির বিশুদ্ধতা পরিমাপ করার কাজটিতে কর্তৃপক্ষের যে যথেষ্ট অনীহা রয়েছে, তা স্পষ্ট হয় যখন গণমাধ্যমে পানি উৎপাদনের অবৈধ কারখানার আবিষ্কারের ঘটনা ফলাও করে প্রকাশ পায়। দেশের অন্যান্য স্থান দূরে থাক, খোদ রাজধানীতে ‘ফিল্টার’ পানির কত সহস্র কারখানা রয়েছে, তার হদিস জানা নেই সিটি কর্পোরেশনেরও। অথচ তারাই দিয়ে থাকে অনুমোদন। আর মান নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের পণ্য পরীক্ষা করার দায়িত্ব বহু পুরনো। ফলে ওয়াসার পানি যে অবৈধভাবে চোরাইপথে ফিল্টার ভর্তি করে বিক্রি করা হচ্ছে, সে বিষয়টি হয়তো ওয়াসাও জানে। এই প্রতিষ্ঠানের বোতলজাত পানি ‘শান্তি’ বাজারে সরবরাহ তেমন নেই। সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সভা-সেমিনারেও এই পানির ব্যবহার দেখা যায় না। ওয়াসার পানি শোধন ছাড়াই ভরা হয় ফিল্টার ও বোতলে, ফলে সস্তামূল্যে এগুলো বিক্রি হয়। বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানও এই লাভজনক ব্যবসা থেকে দূরে নেই। তারাও বোতলজাত পানি বাজারজাত করে আসছে। এদের পাশাপাশি ওয়াসার পানি নামমাত্র পরিশোধন করে দেশব্যাপী বিক্রি করা হচ্ছে কমদামী বোতলে। এগুলোর কোন অনুমোদনও প্রয়োজন পড়ে না। সবচেয়ে ভয়াবহ হচ্ছে ব্যবহৃত বোতল কুড়িয়ে এনে তা না ধুয়েই ওয়াসার লাইনের পানি সরাসরি বোতলজাত করে বিক্রি করা হচ্ছে দেদার। অপরিচ্ছন্ন বোতলে অস্বাস্থ্যকর পানি লঞ্চে, ট্রেনে, বাসস্টেশনে যাত্রীরা কিনতে বাধ্য হচ্ছে পিপাসার্ত হয়ে। আবার এসব অধিকাংশ বোতলই দ্বিতীয়বার ব্যবহারযোগ্য নয়, এসব বোতল এমন সব উপাদানে তৈরি, যা থেকে খাবার পানিতে রাসায়নিক পদার্থ মিশে যায়, এতে ক্যান্সারসহ নানা রোগ হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে।
বোতল তৈরিতে নিকেল, ইথাইন বেনজিন, ইথিলিন অক্সাইড, বেনজিন নামক রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে, যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। যা পানির মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে। এমনকি নদী, ডাস্টবিন, নদী তীরে পড়ে থাকা বোতল কুড়িয়ে নেয়ার জন্য মাস-মাহিনার কিশোররা ব্যবহৃত হয়। অবশ্য পুরনো পানির বোতল চীন দেশে রফতানি হচ্ছে গত ক’বছর ধরে। সেখানে এসব রিসাইক্লিং করে নানা পণ্য তৈরি করা হয়। বোতল ও ফিল্টার পানি পান করে বিপুলসংখ্যক মানুষ। তাই এই পানি বিশুদ্ধ হবেÑ এটা নিশ্চিত করা সরকারেরই দায়িত্ব যেমন, তেমনি জনসচেতনতাও গড়ে তোলা জরুরী। জেনে শুনে বিষপান করতে হবে আর কতকাল মুনাফাখোরদের অর্থগৃধœতার ফাঁদে পড়ে? প্রশ্নটি মীমাংসিত হওয়াও জরুরী।

SHARE