সাতক্ষীরায় কথিত সোর্স নজরুল হত্যাকাণ্ড রহস্যাবৃত

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি॥ ভারত থেকে পাচার করা চোরাচালানের মালামাল ধরিয়ে দেওয়াই কি কাল হলো দেবহাটার নজরুল ইসলামের? নাকি আরও একটি বিয়ের কারণে তাকে প্রাণ দিতে হয়েছে; তা এখনও রহস্যাবৃত।
নিহত নজরুলের পরিবারের সদস্যরা বলছেন, ৩০ আগস্ট ঘটনার রাতে তার সাথে তাদের শেষ কথা হয়। এ সময় তিনি একটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নাম করে বলেন ‘আমি তাদের সাথেই আছি’। তবে সোমবার সাতক্ষীরার আদালতে দায়ের করা মামলার বাদি নজরুলের বাবা মোক্তার মোড়ল বলেন,‘ঘটনার রাতে তিনি ভাইস চেয়ারম্যানের বাসায় আছেন বলে জানিয়েছিলেন’। ওই রাতেই তার মরদেহ কে বা কারা দেবহাটার সখিপুর হাসপাতালে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। দেবহাটা থানা পুলিশ লাশটি উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। ময়না তদন্ত শেষে শুক্রবার তাকে অজ্ঞাত পরিচয় হিসাবে শহরের রসুলপুর গোরস্থানে দাফন করা হয়। এদিকে লাশের ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ায় তার স্বজনরা তাকে নজরুল ইসলাম বলে শনাক্ত করেন।
নিহত নজরুল ইসলাম (৪৮) সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার দক্ষিণ কুৃলিয়া মোড়লপাড়ার মোক্তার মোড়লের ছেলে। তিনি নিজেকে কখনও বিজিবি আবার কখনও পুলিশের সোর্স হিসাবে পরিচয় দিতেন। তবে পুলিশ বলছে তার বিরুদ্ধে দেবহাটা থানায় অন্তত: চারটি চোরাচালানের মামলা রয়েছে। অপরদিকে তিনি সাতক্ষীরার বিজিবি সদস্য আবদুল জব্বার হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি। নিজ এলাকায় তিনি ‘চিট নজরুল’ নামে বেশি পরিচিত।
নিহত নজরুলের ছেলে নাজমুল হোসেন জানান, তার বাবা ৩০ আগস্ট রাত ৮টার দিকে তার কাকা রবিউল ইসলামের কাছে ফোন করে জানান, ‘আমি দেবহাটার ভাইস চেয়ারম্যান মাহবুবুল আলম খোকনের বাসায় আছি’। এরপর রাত ৯ টার দিকে খবর পাওয়া যায় যে তার বাবার মরদেহ কে বা কারা দেবহাটার সখিপুর হাসপাতালে রেখে গেছে। তবে দেবহাটার ভাইস চেয়ারম্যান মাহবুবুল আলম খোকন বলেন ‘ নজরুল আমার বাসায় ছিলেন না। নজরুলের লাশ যখন সখিপুর হাসপাতালে, তখন আমাকে ফোন করেন উপজেলা ছাত্রলীগ সভাপতি আবদুস সবুর। ততক্ষনে সেখানে পুলিশও পৌঁছেছে। খবর পেয়ে আমিও ঘটনাস্থলে যাই। তবে লাশটি যে নজরুলের তা প্রথমে বুঝা যায়নি। কারণ তখন বিদ্যুত ছিল না। আমি ফেসবুকে অজ্ঞাত লাশের কথা বলে একটি স্ট্যাটাস দেই। পরে জানা যায় লাশটি নজরুল ইসলামের’।
স্থানীয়রা বলছেন, নজরুল ইসলাম নিজেও একজন চোরাচালানি। দেবহাটায় ‘মনিরুল রবিউল নজরুল’ নামের একটি চোরাচালান সিন্ডিকেট আছে তাদের। এর মধ্যে নজরুল ইসলাম চোরাচালান ছাড়াও অন্যদের চোরাচালান পণ্য ধরিয়ে দিয়ে বিজিবি ও পুলিশের কাছ থেকে সোর্স সুবিধা আদায় করতেন। গ্রামবাসী জানান, সম্প্রতি দেবহাটার কোমরপুর চোরাচালান ঘাট দিয়ে বিপুল পরিমান ভারতীয় পণ্য বাংলাদেশে পাচার করে দেবহাটার আরেকটি চোরাচালান সিন্ডিকেট। ঈদ উপলক্ষে পাচার হওয়া মোটা টাকার এসব ভারতীয় পোশাক সামগ্রী সোর্স নজরুল ইসলাম গোপন তথ্য দিয়ে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার কাছে ধরিয়ে দেন। এ ঘটনার কয়েক দিনের মাথায় খুন হন নজরুল ইসলাম। তাদের ধারণা এই হত্যার সাথে চোরাচালানের সেই সিন্ডিকেটটি জড়িত রয়েছে যাদের পণ্য খোয়া গেছে। তারা বলেন, এই সিন্ডিকেটটি পরিচালিত হয় সাতক্ষীরা শহর থেকে। তবে এই হত্যার পর থেকে চোরাচালানের দুটি সিন্ডিকেট পরস্পর বিরোধী ভূমিকা নিয়ে একে অন্যের ওপর দোষ চাপাচ্ছেন। ভারতীয় পণ্য হারানো সিন্ডিকেট সদস্যদের জ্ঞিাসাবাদ করলে প্রকৃত রহস্য বেরিয়ে আসতে পারে বলে ধারণা অনেকের।
হত্যার মোটিভ সম্পর্কে জানতে চাইলে দেবহাটা থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. শরিফুল ইসলাম বলেন ‘ঈদের ছুটিতে ছিলাম। ওসিও ছুটিতে। প্রকৃতপক্ষে তদন্ত এখনও সেভাবে এগোয়নি। তবে হত্যার পেছনে দুটি চোরাচালান সিন্ডিকেটের কোন একটি জড়িত আছে বলে প্রাথকিভাবে ধারণা করা যাচ্ছে’।
এদিকে নজরুল হত্যার নেপথ্যে অন্য কোনো কারণ আছে কিনা জানতে চাইলে এলাকাবাসী জানান, নজরুল এ যাবত তিনটি বিয়ে করেছেন। কেউ কেউ বলেন, তিনি ভারতে একটিসহ মোট ছয়টি বিয়ে করেছেন। এ নিয়ে পারিবারিক অশান্তিও রয়েছে। নজরুল প্রথম বিয়ে করেন সেকেন্দ্রা গ্রামের হাফিজা খাতুনকে। এরপর দ্বিতীয় বিয়ে করেন কুলিয়া পাটনিপাড়ার রেবেকা খাতুনকে। সর্বশেষ তিনি বিয়ে করেছেন শাকরার বাবুরবাগানে। তবে নজরুল ইসলামের ছেলে নাজমুল হোসেন বলেন, তার বাবার দুই বিয়ে। তিনি আর কোথাও বিয়ে করেছেন এমন তথ্য তার জানা নেই। এই বিয়ে নিয়ে তাদের পারিবারিক অশান্তিও নেই বলে জানান তিনি।
এদিকে নজরুলকে কোথায় এবং কিভাবে হত্যা করা হয়েছে তা এখনও নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ। এ ব্যাপারে দেবহাটা থানা পুলিশ প্রথম দিনেই একটি অপমৃত্যু মামলা করে।
সোমবার নিহত নজরুলের বাবা মোক্তার মোড়ল বাদি হয়ে সাতক্ষীরার আমলি আদালতে একটি মামলা করেছেন। এ মামলায় একজন জনপ্রতিনিধিসহ চোরাচালান সিন্ডিকেটের চার সদস্যের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও চারজনের কথা বলেছেন। আদালত মামলাটি এফআইআরভুক্ত করে তদন্ত শেষে রিপোর্ট দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এছাড়াও ছেলে নজরুলের লাশ কবর থেকে তুলে ফের ময়না তদন্তের জন্য আবেদন করেছেন বাদি বাবা মোক্তার মোড়ল।

SHARE