সাতক্ষীরা প্রতিনিধি ॥ সেকালের এনালগ যুগের পুরানো কথা এখন নতুন ভাবে ডিজিটাল হয়েছে। আকাশে যত তারা পুলিশের ততো ধারা। আগে ছিল ৫৪ ধারা আর এখন হয়েছে ৩৪ ধারা। পুলিশের যত অপকর্ম তা জায়েজ করতেই ৩৪ ধারা প্রয়োগ হচ্ছে হরহামেশাই। আর এরমধ্যেই চলছে কর্ম অপকর্ম ও ব্যবসা বাণিজ্য।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বাশদহা কুলিয়াডাঙ্গা গ্রামের মোক্তার গাজীর ছেলে আক্তারুজ্জামান। একেবারেই গ্রাম্য পরিবেশে চলাচলের পাশাপাশি কৃষি কাজে নির্ভরশীল। গত ২৪ অগাস্ট কৃষক আক্তারুজ্জামান তার বাড়ির ৪টি ছাগল বাশদহা বাজারে নিয়ে বিক্রি করেন ৪০ হাজার টাকায়। ঈদ উপলক্ষে ছাগল বিক্রির ৪০ হাজার টাকা তার বাড়িতেই ছিল। বিষয়টি স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে সদর থানার এসআই আসাদুজ্জামান খবর পান। বাড়িতে টাকা গচ্ছিত থাকার খবর পেয়েই ২৭ অগাস্ট রাত ২টার দিকে এসআই আসাদুজ্জামানসহ সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে কৃষক আক্তারুজ্জামানের বাড়িতে হাজির হন। রাত দুপুরে তাদের ঘুম থেকে ডেকে তুলে কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই বাড়ির বিভিন্ন স্থানে তল্লাসী শুরু হয়। এক পর্যায়ে কোন কিছু না পেয়ে আক্তারুজ্জামানকে আটক করেন। একই সময়ে তার প্রতিবেশি শহিদুলের ছেলে শিমুল হোসেনকেও আটক করে পুলিশ। এবার দু’জনকে রাতেই থানায় নিয়ে আসে। সকালে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ থানায় আসে ধৃত দুইজনকে ছাড়াতে। এদের মধ্যে বাশদহার জনৈক বিপুল ও একজন সাবেক মেন্বরসহ কয়েকজন। তাদেরকে ছাড়াতে থানায় আসলেই থানার কম্পিউটার রুমে বসে শুরু হয় দর কষাকষি। দারোগা আসাদুজ্জামান তাদের বলেন, ছাগল বিক্রির ৪০ হাজার টাকা তো বাড়িতেই আছে, অতিরিক্ত আর কত দেবেন ? এটা শুধুমাত্র আক্তারুজ্জামানকে ছাড়ানোর ফি। ছাগল বিক্রির টাকা বাড়িতে আছে শুনে তদবির কারকরা তো হতবম্ব ! এসব খবর পুলিশকে দিল কারা। অবশেষে তদবির কারকরা কোন সিদ্ধান্ত নিতে না পেরে বাড়িতে ফিরে যান। পরদিন (২৯ আগস্ট) বাড়িতে থাকা ছাগল বিক্রির ৪০ হাজার টাকা নিয়ে শুরু হল দেনদরবার। কিন্তু এসআই আসাদুজ্জামানকে রাজি করানো যাচ্ছে না। কৃষক আক্তারুজ্জামানের বিরুদ্ধে দারোগার কাছে বিস্তর অভিযোগ। টাকা আরও লাগবে। অবশেষে কোন রকমে ছাগল বিক্রির টাকাটা নিয়ে তিনি রাজি খুশি হলেন। তবুও রক্ষা আক্তারুজ্জামানের কিন্তু আটক আরেক দিনমজুর যুবক কৃষক শিমুলের কি হবে ?
এবার শিমুলকে ছাড়াতে শুরু হলো নতুন করে দেনদরবার। এখানে শিমুলের দরুন ফের দারোগার দাবি ৩০ হাজার টাকা। কিন্তু পরিবার থেকে কোন টাকা দেয়ার মত নেই তার। তবুও তদবির কারকরা আলোচনা করে বাড়িতে গেলেন। আগে ছাগল বিক্রির টাকায় একজন হল, এবার শিমুলের জন্য কি বিক্রি করবে। এনিয়ে ভাবতে ভাবতে তদবির কারকরা বাড়িতে যেয়ে হ্যাতা খ্যাতা আর যাকিছু ছিল তা বিক্রি করে ১৬ হাজার টাকা যোগাড় হল। তা নিয়ে ৩০ তারিখ সকালে থানায় আসলে যদিও মোটেই দারোগা বাবু রাজি হচ্ছে না। তবুও হাতে পায়ে ধরে রাজি খুশি করিয়ে মিটমাট হল ১৬ হাজার টাকায়।
গ্রাম্য দুই নীরিহ কৃষক ধরে ৫৬ হাজার টাকার দফা-রফা করে এবার পুলিশের শর্ত জালে জড়িয়ে পড়লো তদবির কারকরা। টাকা নিয়ে জানানো হয় যে তাদেরকে ছোট ধারায় আদালতে চালান করতে হবে। আজই জামিন হয়ে বাড়িতে ফিরতে পারবে এমন নিশ্চয়তা দিল। রাজি না হয়েও কিছু করার নেই। বুধবার ৩০ অগাস্ট দুপুরে ৩৪ ধারায় আদালতে সোপর্দ করলো এসআই আসাদুজ্জামান। ওইদিনই তারা দু’জনে জামিন দিয়ে বাড়িতে ফিরলো।
এর একমাস আগে বাবুলিয়া বাজার থেকে জনৈক মজনুকে ধরে নিয়ে আসে। তার কাছ থেকে ৬০ হাজার টাকা নিয়ে থানা থেকে ছেড়ে দেয় এই দারোগা। একই এলাকার এলাহী বক্সের ছেলে বাদশাকে ধরে থানায় এনে ৯০ হাজার টাকা নিয়ে ৩৪ ধারায় চালান দেয় এই দারোগা। দেড় মাস আগে পাশর্^বর্তী পরানদহা দত্তডাঙ্গা এলাকার মৃত মতিয়ার রহমানের ছেলে জামায়াত নেতা সরোয়ার হোসেনকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। পরে ৫০ হাজারে দফা রফা করে একই এলাকার গ্রাম ডাক্তার নুরুল ইসলামের নিকট দিয়ে দেয়।
অপরদিকে মাস তিনেক আগে এসআই আসাদুজ্জামান হঠাৎ এক রাতে হাজির হয় সদরের বাশদহা কাজীপাড়া গ্রামের লুৎফর ঢালীর ছেলে ট্রলি চালক আরিফুলের বাড়িতে। উঠিয়ে নিয়ে আসেন থানায়। তার ভগ্নিপতি সাতক্ষীরা শহরের একটি দৈনিক পত্রিকায় মেশিনম্যান হিসেবে চাকুরি করেন। আটক আরিফুলকে ছাড়ার জন্য ওই পত্রিকা অফিস থেকে সুপারিশ করা হলে আরিফুলের নিকট আত্মীয়দের জানানো হয় বিষয়টি সাংবাদিকরা জেনে গেছে। এখন ছাড়তে গেলে টাকা বেশি লাগবে। অবশেষে সাংবাদিকদের সুপারিশের পরও দরিদ্র ট্রলি চালক রাতে সুদ করে ৪০ হাজার টাকা ম্যানেজ করে পুলিশকে দিয়ে পরদিন দুপুরে বাড়িতে যায়।
সাতক্ষীরা সদর থানার এই দারোগার বিরুদ্ধে এমন কোন অভিযোগ নেই যা তিনি করছেন না। পুলিশের উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা বিষয়টি আদৌও জানেন কি এমন প্রশ্ন অনেকের। তবে অভিজ্ঞ মহল মনে করেন বিস্তর অভিযোগের বোঝা মাথায় নিয়ে বহালতবিয়াতে চাকুরি করার নেপথ্যে উপরি কর্তার আশীর্বাদ রয়েছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে এসআই আসাদুজ্জামান সাংবাদিকদের জানান, আক্তারুজ্জামান ও শিমুলকে আটকের বিষয়ে কিছু মনে করতে পারছি না। তাদেরকে বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে কি না তাও বলতে পারছি না। তবে থানার বাইরে আছি। থানায় ঢুকে খাতাপত্র না দেখে কিছু বলতে পারবো না। আর্থিক সুযোগ সুবিধা নেয়ার বিষয়ে তিনি অস্বীকার করে বলেন, টাকা পয়সার ব্যাপারে আমি কিছুই জানিনা।

SHARE