কৃষি জমির ‘টপ সয়েল’ রক্ষায় উদ্যোগ নেই- শেষ
‘বিকল্প ইটের প্রচার ও প্রসারের পরামর্শ’

6

মিলন রহমান:  যশোরের ইটভাটাগুলোতে নানা কৌশলে পোড়ানো হচ্ছে কৃষি জমির মাটি। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ফসলের ক্ষেত। পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। উজাড় হচ্ছে গাছ। কাঠ-কয়লা পুড়ে নির্গমণ হওয়া গ্রিনহাউজ গ্যাসে ক্ষতির শিকার হচ্ছে পরিবেশ। বহুবিধভাবে প্রচলিত ইটভাটাগুলো পরিবেশের ক্ষতির কারণ হলেও এ নিয়ে ভাবনা বা প্রতিকারে উদ্যোগ নেই বললেই চলে। অথচ এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সচেতনতার বিকল্প নেই। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইটভাটাগুলোর সার্বিক ক্ষতি ও পরিবেশ দূষণ সম্পর্কে জনসাধারণকে সচেতন করতে হবে। একইসাথে বিকল্প অপোড়ানো ইট সম্পর্কে প্রচার ও এর প্রসারেরও প্রয়োজন রয়েছে-এমন মত তাদের।
যশোর জেলা ইট প্রস্তুতকারী মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, এ জেলায় ১৬৭টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে ১৪০টির মত ভাটা চালু রয়েছে। এই ভাটাগুলোতে প্রতি মৌসুমে প্রায় ৪২ কোটি ইট উৎপাদিত হয়। এ জন্য প্রায় ৫ কোটি সিএফটি মাটি, ১ লাখ ৫ হাজার টন কয়লা ও প্রায় ১ হাজার টন কাঠের প্রয়োজন হয়।
প্রচলিত এই ইটভাটাগুলো পরিবেশে কতখানি বিরূপ প্রভাব ফেলে তা নিয়ে কথা হয় যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. সাইবুর রহমান মোল্যার সাথে। তিনি বলেন, প্রথমেই বলতে হবে মাটির বিষয়টি। জমির টপ সয়েল ছাড়া ইট হয় না। এক ইঞ্চি টপ সয়েল তৈরি করতে বহু বছর সময়ের প্রয়োজন হয়। অথচ সেই মাটি অবলীলায় ইটভাটায় পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। আর পোড়ানোর জন্য কয়লার কথা বলা হলেও প্রচুর কাঠও পুড়ছে ইটভাটাগুলোতে। কাঠের জোগান দিতে গিয়ে উজাড় হচ্ছে বন।
এই কাঠ ও কয়লা পুড়িয়ে প্রচুর পরিমাণে কার্বন-ডাই-অক্সাইড, কার্বন-মনোঅক্সাইডসহ গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ করা হচ্ছে। এছাড়া ইটভাটার ধোঁয়া, ছাই মানুষের স্বাস্থ্যগত ও ফসলের ক্ষতি করছে। সবমিলিয়ে ইটভাটাগুলো পরিবেশ, বায়ু, পানি দূষণের জন্য চিহ্নিত। এ জন্য সার্বিক বিষয়ে সচেতনতা জরুরি বলেও মনে করেন তিনি।
এদিকে, কৃষিজমির ক্ষতির পাশাপাশি কাঠ-কয়লা পোড়ানোসহ বায়ু দূষণ, পরিবেশ ও প্রতিবেশের ক্ষতির ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সুইচ এশিয়া-২ প্রোগ্রামের সহায়তায় ‘প্রমোটিং সাসটেইনেবল বিল্ডিং ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক প্রকল্প কাজ করছে। পোড়া ইটের পরিবর্তে বিকল্প ইট ও পরিবেশবান্ধব নির্মাণ সামগ্রী তৈরি ও ভোক্তাদের মাঝে সচেতনতা, সক্ষমতা ও চাহিদা তৈরির লক্ষ্যে অক্সফ্যাম, হাউজিং এন্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এইচবিআরআই), বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) ও জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।
এই প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, কার্বন নিঃসরণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি সারা বিশ্বেই আলোচিত। আমাদের সরকারও এ ব্যাপারে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। আমাদের দেশের প্রচলিত ইটভাটাগুলো প্রতি বছর ৯.৮ মিলিয়ন টন গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ করে। পাশাপাশি মাটির টপ সয়েল কেটে নিয়ে জমির উর্বরতা বিনষ্ট করছে। পরিবেশের এই ক্ষতি কমিয়ে আনার জন্য তারা কাজ করছেন। এজন্য প্রচলিত ইটের পরিবর্তে বালি, সিমেন্ট, পাথরের টুকরোর মিশ্রণকে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে ব্লক-কাদা মাটির সঙ্গে রাসায়নিক পদার্থ যোগ করে ইট তৈরি করা হচ্ছে। যা ব্যয়সাশ্রয়ী, অধিক টেকসই।
যশোর জেলা ইট প্রস্তুতকারী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কাজী নাজির আহমেদ মুন্নুও বিকল্প ইট সম্পর্কে ধারণা পেয়েছেন। তিনি জানান, আমরা ভাটাগুলোতে প্রচলিত নিয়মে পুড়িয়ে ইট তৈরি করি। আর হাউজিং এন্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এইচবিআরআই) গবেষণা করে বিভিন্ন ধরণের ব্লক বা বিকল্প ইট তৈরি করছে। এই অপোড়ানো ইটের প্রচলন ঘটাতে হলে এর প্রযুক্তি ও কাঁচামাল সহজলভ্য করতে হবে। পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় সহনীয় এবং বাজার সৃষ্টি করতে হবে।
তিনি উল্লেখ করেন, প্রচলিত ভাটাগুলোকে অপোড়ানো ইটের দিকে নিতে হলে সরকারি পর্যায় থেকে পদক্ষেপ প্রয়োজন। ভাটাগুলোকে প্রযুক্তি, প্রণোদনা, ঋণসহ সব ধরনের সহযোগিতা করলে তারাও পরিবেশবান্ধব ইট উৎপাদনে আগ্রহী। আর সরকারি নির্মাণে যদি বিকল্প ইট ব্যবহারের ঘোষণা দেয়া হয়, তাহলে বড় একটি বাজার সৃষ্টি হবে। কারণ সারাদেশে উৎপাদিত ইটের একটি বড় অংশ সরকারি নির্মাণকাজে ব্যবহার করা হয়।
ইটভাটাগুলোর নানা ধরনের পরিবেশ দূষণ ও কৃষি জমির মাটি গ্রাস নিয়ে কথা হয় যশোর পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মোহাম্মদ আতাউর রহমানের সাথে। তিনি জানান, ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১৩ অনুযায়ী লাইসেন্স নিয়ে যশোরের ভাটাগুলো ইট উৎপাদন করছে। এখানকার অধিকাংশ ইটভাটা জিগজ্যাগ, দু’টি ছাড়া বাকীগুলো ফিক্সড চিমনি’র। তবে অনুমোদিত ভাটাগুলোও যে পরিবেশ দূষণ করে না তা নয়। আর কাঠ পোড়ানো, কৃষি জমির মাটি ব্যবহারসহ আইন অমান্য করলে এদেরকে শাস্তির আওতায় আনা হয়। এছাড়া কৃষি মাটি ব্যবহার ও কাঠ পোড়ানো বন্ধে তারা ভাটা মালিক, জনপ্রতিনিধিসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাথে মতবিনিময়ও করেন। তবে বিকল্প ইটের প্রসার ঘটানো গেলে তা পরিবেশ রক্ষায় অত্যন্ত কার্যকরি পদক্ষেপ হবে বলে তিনি মনে করেন।
যশোর জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আহমেদ কবীরের মতে, ইটভাটার ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে মানুষ জানলেও ‘বিকল্প ইট’ দিয়ে নির্মাণের ব্যাপারে কোনো ধারণা নেই। এ কারণে এটির প্রচার প্রচারণা চালাতে হবে। পাশাপাশি সরকারের নীতি নির্ধারণী পর্যায় থেকে বিকল্প ইট ব্যবহারের জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে।
ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ আইডিইবি’র সাবেক সভাপতি এম আর খায়রুল উমাম বলেন, প্রচলিত ইটভাটাগুলো পরিবেশ ধ্বংস করছে, কৃষি জমি নষ্ট করছে এনিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। এটি প্রতিরোধে বিকল্প হিসেবে বিভিন্ন ধরনের ব্লক বা অপোড়ানো ইট ব্যবহার করা যেতে পারে। এই ব্লক-ইট ব্যবহার করে সরকারি স্থাপনা নির্মাণ করে মানুষকে দেখাতে হবে যে, এটি অধিক টেকসই, সাশ্রয়ী। তাহলে বাজারে এর চাহিদা সৃষ্টি হবে। এজন্য সরকারি বিভিন্ন এজেন্সি, বেসরকারি সংস্থাসহ পরিবেশ নিয়ে যারা কাজ করেন, সকলের সমন্বিত অংশগ্রহণ থাকতে হবে।
যশোর পৌরসভার শহর পরিকল্পনাবিদ সুলতানা সাজিয়া বলেন, প্রচার প্রচারণার মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব বিকল্প ইটকে পরিচিত করে তুলতে হবে। এই প্রযুক্তিকে উৎপাদনের পর্যায়ে এনে অধিক টেকসই ও ব্যয়সাশ্রয়ী করতে হবে। তাহলে মানুষ এতে আগ্রহী হবে। এজন্য ভাটা মালিকদের উৎসাহ, প্রশিক্ষণ, প্রণোদনা দিলে এই ইট উৎপাদনের পদক্ষেপ আরও কার্যকর হবে।
যশোর জেলা ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক শেখ শাহীন মাহমুদ বলেন, পরিবেশবান্ধব ব্লক বা অপোড়ানো ইটের প্রচলন ঘটাতে হলে ভাটায় বাণিজ্যিকভাবে এর উৎপাদন শুরু করতে হবে। পাশাপাশি ‘উৎপাদিত ইটের একটি অংশ অপোড়ানো বা ব্লক হতে হবে’-ভাটাগুলোকে এমন নীতিমালার আওতায় আনা যেতে পারে। বাজারে এই ইট সহজলভ্য হলে আমরাও তা ব্যবহার করবো এবং উৎসাহ দেবো।

আরো দেখুন: কৃষি জমির ‘টপ সয়েল’ রক্ষায় উদ্যোগ নেই-১

যশোরের ইটভাটায় পুড়ছে ৫ কোটি সিএফটি মাটি