কৃষি জমির ‘টপ সয়েল’ রক্ষায় উদ্যোগ নেই-১
যশোরের ইটভাটায় পুড়ছে ৫ কোটি সিএফটি মাটি

মিলন রহমান:  যশোরের ইটভাটাগুলোতে প্রতি মৌসুমে উৎপাদিত হচ্ছে প্রায় ৪২ কোটি পিচ ইট। এই ইট উৎপাদনের জন্য পোড়ানো হচ্ছে প্রায় ৫ কোটি সিএফটি মাটি। আর এই মাটির সিংহভাগই যোগান দিচ্ছে কৃষি জমি। ইটভাটা মালিক সমিতি, পরিবেশ অধিদপ্তর, কৃষি বিভাগ, মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটসহ সংশ্লিষ্ট একাধিক প্রতিষ্ঠানের তথ্য উপাত্ত থেকে এ চিত্র উঠে এসেছে। কৃষি জমির সবচেয়ে মূল্যবান অংশ ‘টপ সয়েল’ হিসেবে পরিচিত এ মাটি ইটভাটাগুলোর পেটে গেলেও এ নিয়ে তেমন তাপ-উত্তাপ নেই কোনো প্রতিষ্ঠানেরই। অথচ ইটভাটার সর্বশেষ আইন অনুযায়ী, কৃষিজমির মাটি ভাটায় ব্যবহার নিষিদ্ধ। পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, এভাবে কৃষি জমির টপ সয়েলের বিনাশ করা হলে ফসল উৎপাদনের ওপরে এর মারাত্মক বিরূপ প্রভাব পড়বে। আর কৃষির এই হুমকির পাশাপাশি ইটভাটার পরিবেশ দূষণ নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ।
যশোর জেলা ইট প্রস্তুতকারী মালিক সমিতি জানায়, এ জেলায় ১৬৭টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে ১২০টির মত জিগজ্যাগ ইটভাটা (হাওয়া ভাটা)। বাকীগুলোর মধ্যে কয়েকটি অটো এবং অবশিষ্ট ফিক্সড চিমনির। সবচেয়ে বেশি ৪০টি ইটভাটা রয়েছে যশোর সদর উপজেলায় এবং সবচেয়ে কম ৯টি কেশবপুর উপজেলায়। এছাড়া মণিরামপুরে ৩২টি, শার্শায় ২৩টি, ঝিকরগাছায় ২০টি, বাঘারপাড়ায় ১৮টি, চৌগাছায় ১৫টি ও অভয়নগরে ১০টি ইটভাটা রয়েছে। তবে সবগুলো চালু না থাকায় প্রতি মৌসুমে গড়ে ১৪০টির মত ভাটা ইট উৎপাদন করে থাকে। শুষ্ক মৌসুমে এই ইট উৎপাদনের সময়কাল ২০ থেকে ২২ সপ্তাহ। এ সময়ের মধ্যে কোনো ইটভাটা ২০ লাখ আবার কোনোটি ৬০ লাখ ইটও উৎপাদন করে থাকে।
যশোর জেলা ইট প্রস্তুতকারী মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, গড়ে ভাটা প্রতি ৩০ লাখ হিসেবে ধরলে যশোরের ১৪০টি ইটভাটা থেকে প্রতি মৌসুমে ৪২ কোটি পিচ ইট উৎপাদিত হয়। আর এ জন্য প্রতিভাটায় ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার ট্রাক মাটি দরকার হয়। প্রতি ট্রাকে ১০০ থেকে ১২০ সিএফটি মাটি হিসেবে এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫ কোটি সিএফটি।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের মতে, এই জেলায় নদী, খাল, জলাশয় বা বিকল্প স্থান থেকে মাটি পাওয়ার সুযোগ কম থাকায় ওই মাটির সিংহভাগই ভাটা মালিকরা সংগ্রহ করেন কৃষি জমি থেকে। কৃষি জমির ওপর এই ‘আগ্রাসনে’ উদ্বেগ রয়েছে কৃষি বিভাগ ও মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এ জেলায় মোট আবাদী জমির পরিমাণ ১ লাখ ৯৮ হাজার ৪১৬ হেক্টর। অথচ ৬ বছর আগে এর পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৩ হাজার ৪১৬ হেক্টর। অর্থাৎ ৬ বছরে আবাদী জমি কমেছে ৫ হাজার হেক্টর। এর একটি অংশ কৃষি জমির টপ সয়েল কেটে নেয়ার কারণে। যদিও টপ সয়েল কেটে নেয়ার পর সে জমিতে বাড়তি সার, কীটনাশক দিয়ে চাষাবাদ করেন কৃষকেরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোর’র উপ পরিচালক কাজী হাবিবুর রহমান বলেন, যশোরে কৃষি জমি থেকে টপ সয়েল কেটে নেয়ার একটি মারাত্মক প্রবণতা রয়েছে। মাটির সবচেয়ে উর্বর অংশ কৃষি জমি থেকে ভাটায় চলে যাওয়ায় ফসল উৎপাদনের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ে। বাড়তি জৈব ও রাসায়নিক সার ব্যবহার করে কৃষক উৎপাদন ঠিক রাখতে চাইলেও তা সবসময় সম্ভব হয় না। উপরন্তু উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যায়।
যশোর মৃত্তিকা উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জিএম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মাটির জৈব ও পুষ্টি উপাদান উপরিভাগের ৩ থেকে ৫ ইঞ্চির মধ্যে বিরাজমান। ফলে এই মাটি কেটে নিয়ে যাওয়া যে, কি ভয়াবহ ক্ষতি তা কৃষকরা জানেন না। এ জন্য কোনো কারণ ছাড়াই, বা সামান্য কারণেও তারা মাটির উপরিভাগ ইটভাটায় বিক্রি করে দিচ্ছেন। অথচ এই টপ সয়েল পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে ১৫ থেকে ২০ বছর বা তারও বেশি সময় লাগে। তাই কৃষি জমি রক্ষায় কৃষকদের এই মারাত্মক প্রবণতা থেকে সরিয়ে আনা দরকার। জিএম মোস্তাফিজুর রহমান আরও উল্লেখ করেন, ‘কৃষিতে ইটভাটার প্রভাব’ বিষয়ে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের একটি গবেষণা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এর প্রতিবেদন প্রকাশ হলে ক্ষতির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন সম্ভব হবে।
কৃষি জমির টপ সয়েল নিয়ে এই উদ্বেগ সম্পর্কে ধারণা নেই কৃষকদের। তারা সামান্য প্রয়োজনে বা কোনো প্রয়োজন ছাড়াই মাটির উপরিভাগ তুলে দিচ্ছেন ভাটা মালিকদের কাছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভুল ধারণা থেকেও তারা মাটি বিক্রি করছেন।

ইটভাটায় টপ সয়েল বিক্রি নিয়ে যশোর জেলার বিভিন্ন এলাকায় খোঁজখবর নিয়ে নানা চিত্র উঠে এসেছে। কোথাও কৃষককে বোঝানো হয়, তোমার জমি উঁচু, সেচের পানি নেমে যাবে, বোরো আবাদ হবে না। তাই উপর থেকে মাটি ভাটায় বিক্রি করে দাও। কোথাও বলা হয়, উপরের মাটিতে ভাইরাস-ময়লা। উপরের মাটি বিক্রি করে নিচের ‘ভাল’ মাটিতে চাষ করলে ভাল ফসল হবে। এভাবেই নানাভাবে কৃষককে বিভ্রান্ত ও প্ররোচিত করা হয় টপ সয়েল বিক্রির জন্য। আর এ কাজে সক্রিয় রয়েছে ভাটায় মাটি সরবরাহকারী কন্টাক্টররা।
যশোর সদর উপজেলার দোগাছিয়া গ্রামের কৃষক জুলফিকার আলী বলেন, জমির উপরের মাটিতে ময়লা-ভাইরাস থাকে। এজন্য তিনি উপর থেকে মাটি ইটভাটায় বিক্রি করে দিয়েছেন। একই ধরনের বক্তব্য বাঘডাঙ্গা গ্রামের কৃষক আবু বক্কারের। এমন ধারণা কোথায় পেলেন জানতে চাইলে তাদের বক্তব্য দোগাছিয়া গ্রামের তরিকুল ইসলাম তাদের এমন কথা বলেছে। এজন্য তরিকুলের (ইটভাটার মাটির কন্টাক্টর) মাধ্যমে তারা ইটভাটায় মাটি বিক্রি করেছে।
আর একই গ্রামের কৃষক নিয়ামত আলী জানান, তার জমিটি আশপাশের জমি থেকে কিছুটা উঁচু। স্যালোমেশিন মালিক উঁচু জমিতে সেচের পানি দিতে চায় না। আবার উঁচু জমিতে পানি বেশিক্ষণ ধরেও রাখা যায় না। এ জন্য তিনি উপর থেকে মাটি বিক্রি করে ‘জমি সমান’ করছেন। অপর কৃষক আব্দুল ওয়াদুদও একই কারণে জমির মাটি বিক্রি করছেন উল্লেখ করে বলেন, মাটি কেটে নিলে কিছুটা ক্ষতি হয়, তিনি জানেন। সার-মাটি দিয়ে তা তিনি পুষিয়ে নেবেন।
আর সদর উপজেলার হাটবিলা গ্রামের কৃষক আব্দুল মজিদ ইটভাটায় মাটি বিক্রি করেছেন কোনো কারণ ছাড়াই। তিনি বলেন, ‘মাটির (ইটভাটার) কন্টাক্টর বললো, মাটি বিক্রি করলে কিছু টাকা পাওয়া যাবে, তাই ভাটায় মাটি বিক্রি করেছি। দেড় বিঘা জমি (পৌনে এক একর) থেকে ৮০ টাকা দরে আড়াইশ’ ট্রাক মাটি বিক্রি করেছি ভাটায়।’
অথচ ইটভাটার সর্বশেষ আইন অনুযায়ী, কৃষি জমির মাটি ভাটায় ব্যবহার নিষিদ্ধ। ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১৩ এ উল্লেখ রয়েছে, ‘ আপাতত বলবৎ অন্য আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, কোন ব্যক্তি ইট প্রস্তুত করিবার উদ্দেশ্যে কৃষিজমি বা পাহাড় বা টিলা হইতে মাটি কাটিয়া বা সংগ্রহ করিয়া ইটের কাঁচামাল হিসাবে উহা ব্যবহার করিতে পারিবেন না।’ এই আইন লঙ্ঘনের জন্য সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদ- বা ২ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ডের বিধান রয়েছে।
এনিয়ে কথা হয় পরিবেশ অধিদপ্তর যশোরের উপ পরিচালক মোহাম্মদ আতাউর রহমানের সাথে। তিনি বলেন, যশোরে ১৩৮টি ভাটা সচল রয়েছে। এর সিংহভাগই জিগজ্যাগ। এই জেলার ইটভাটাগুলো কৃষি জমির মাটির উপর নির্ভরশীল। আর অল্পকিছু ভাটা গোপনে কাঠও পুড়িয়ে থাকে। এ জন্য তারা এই ভাটাগুলো নিয়মিত পরিদর্শন ও খোঁজখবর রাখেন। অনিয়ম পেলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জেল-জরিমানাও করা হয়।
এদিকে, কৃষিজমির ক্ষতির পাশাপাশি কাঠ-কয়লা পোড়ানোসহ বায়ু দূষণ, পরিবেশ ও প্রতিবেশের ক্ষতি করছেও প্রচলিত ইটভাটাগুলো। এ ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সহায়তায় ‘প্রমোটিং সাসটেইনেবল বিল্ডিং ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক প্রকল্পও কাজ শুরু করেছে। প্রকল্পের আওতায় প্রচলিত পোড়া ইটের পরিবর্তে ‘বিকল্প ইটের’ প্রযুক্তিও প্রচারের আলোয় আনছে।
যশোরের ইটভাটাগুলোর সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা হয় যশোর জেলা ইট প্রস্তুতকারী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও ভৈরব ব্রিক্স’র মালিক কাজী নাজির আহমেদ মুন্নুর সাথে। তিনি বলেন, যশোরের এই ভাটাগুলোতে ইট উৎপাদনের জন্য এই বিপুল পরিমাণ মাটির চাহিদা রয়েছে। তবে তারা মোট চাহিদার ৪০ শতাংশের মত মাটি কৃষি জমি থেকে নেয়া হয় বলে দাবি তার। বাকীটা তারা ঘের, মজাপুকুরসহ বিভিন্ন খননকাজ থেকে এবং কৃষি জমির বাইরে থেকে সংগ্রহ করেন। আর ভাটাগুলো এখন কয়লা দিয়েই ইট পুড়িয়ে থাকে। তবে ভাটায় আগুন ধরানোর জন্য প্রথমে সামান্য কিছু কাঠ পোড়াতে হয়। তবে গোপনে দু’একটি ভাটা কিছু কাঠ পোড়াতে পারে বলেও স্বীকার করেন তিনি।

আরো দেখুন: কৃষি জমির ‘টপ সয়েল’ রক্ষায় উদ্যোগ নেই- শেষ

‘বিকল্প ইটের প্রচার ও প্রসারের পরামর্শ’

Share Button